ট্রাফিক জ্যামের শহর

পূর্ব পরিচিত,

যদি ভীষণ কর্মব্যস্ত শহরের ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ি,
তবে নিশ্চই তোমাকে মনে পড়বে।
যদি সামান্য মিছিল হলেই সার বেঁধে গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়,
যদি সকালে কার্ড পাঞ্চ করার তাড়ায় অস্থির হয়ে উঠি
আর ঠিক তখনই অবরোধ শুরু হয়
তবে তোমায় মনে পড়বে।
যদি সন্ধ্যেবেলায় ভীষণ ভিড়ে আটকে পড়ি,
কোনদিক দিয়েই পরিত্রাণের রাস্তা না থাকে,
যদি শুধু বাসে বসে গলদঘর্ম হই,
যদি ফোনটা হাতে নিয়ে হোয়াটস্যাপটুকুও দেখতে না ইচ্ছে করে
তবে নির্ঘাত তোমায় মনে পড়বে।
হয়তো বসে থাকব, সেই বিরক্তির স্রোতের মধ্যেও
আর দেখব, অন্যের ভিডিও কল, জোরে জোরে গান শোনা,
এতটুকু বিচলিত না হয়ে মুভি দেখা,
হয়তো তোমাকে ভুলতে উঁকি দেব তাদের মোবাইলে
তারা বিরক্ত হবে, বন্ধ করে দেবে ফোন, কিংবা সরিয়ে নেবে,
আমার নাগালের বাইরে,
আমি বাইরে তাকাব, রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির স্রোত,
ঘড়ির কাঁটায় আটটা দেখে হা হুতাশ করব,
গল্পে পড়া মরুভূমির উটের সারির কথা মনে পড়বে,
সাদা গাড়ির আধিক্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলব,
কালো গাড়ির কালোকাঁচ দেখে ঈর্ষা করব,
হলদে ট্যাক্সির জন্য মনকেমন করবে,
তোমার সাথে ট্রামভ্রমণের স্মৃতি উস্কে যাবে,
ওলা ক্যাব দেখে মুচকি হাসব,
আর এসবের মধ্যেই তোমাকে ভুলে যাওয়ার,
ভুলে থাকার ভীষণরকম চেষ্টা করব।
তবু ট্রাফিক জ্যাম রোজই হবে,
আর রোজ না চাইলেও তোমাকে মনে পড়বে !

চোখের তারায় আয়না ধরো

আমার কৈশোরে এমি ওয়াইনহাউসেকে দেখেই প্রথম জেনেছিলাম winged eyeliner বা ডানাওয়ালা আইলাইনার আসলে কি বস্তু; অবশ্য সত্তর আশির দশকের নায়িকারাও এভাবেই তাদের আঁখিপাতাকে সাজাত। আমি যে সময়টায় পনেরো-ষোলো তখন সবাই ওই আইলাইনারই লাগত, কখনও বা ইচ্ছে হলে একটু মাস্কারা, এর বেশি কিছু পরার চল ছিলনা, অন্তত টিনএজের মেয়েদের মধ্যে। এখন যখন দেখি সব বাচ্চা মেয়েরা কি নিরুপদ্রবে আইভ্রু পর্যন্ত এঁকে নিচ্ছে আইভ্রু লাইনার দিয়ে , তখন হিংসে তো হয়ই।

আমি তখন সবে মাত্র ষোলো। আইলাইনার, কাজল, মাস্কারা কিছুই ব্যবহার করি না, শুধু কোনো নিমন্ত্রণ থাকলে একটু আইলাইনার লাগাতাম। এসবের মধ্যেই হঠাৎ গোল বাঁধল একটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারকে কেন্দ্র করে; আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া আমাকে একটি ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার উপহার দিলেন…তখন পর্যন্ত ওই বস্তুটি কি, খায় না মাথায় দেয় আমিতো তাও জানতাম না; কিন্তু উনি ব্যবহার করা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। যেভাবে আমরা সাদা কাগজে স্ট্যাম্প মারি কালি দিয়ে , ঠিক তেমনি! এখানে স্ট্যাম্প হল ওই সরু আইলাইনারের মুখে লাগান একটা ছোট্ট তারা, আর বোতাম টিপলে ভিতর থেকে কালি আসবে…ব্যাস, এবার চোখের কোণে, গালে, থুতনিতে যেখানে ইচ্ছে ষ্টার স্ট্যাম্প মেরে নিলেই হল। অনেকে কাজল পেন্সিল দিয়ে চোখের পশে উল্কি আঁকে, আর এ হল রেডিমেড উল্কি, অনেক বেশি সূক্ষ্য, নিখুঁত আর শুধু একটি স্ট্যাম্প দিলেই কেল্লাফতে! কি সুন্দর চোখের পলকে ষ্টার ছাপ পড়ে যেত, দেখেই ভাল লাগত।

আমি ঠিক করলাম এটা পরে বন্ধুদের চমকে দিতে হবে, কিন্তু স্কুলে তো আর ওসব পরে যাওয়া সম্ভব নয়! স্কুলে তখন প্রায়ই নখ চেক হত, আর সেখানে আইলাইনার পরে গেলে তো আর রক্ষে নেই। তো আমি বন্ধুদের চমকে দেওয়ার জন্য দুর্গাপুজোর সপ্তমী বাছলাম। ঠিক হল ঐদিন বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখব। কাউকে ঘুণাক্ষরেও আমার এই আইলাইনারের কথা বললাম না, স্কুলে যথারীতি পুজোর ছুটি পড়ে গেল আর আমি অপেক্ষায় থাকলাম কবে ওই ডানাওয়ালা আইলাইনার আঁকব, ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে নিজেকে সাজাব আর আমার বন্ধুরা আমাকে দেখে চমকে যাবে। মেয়েরা কি আর শুধু ছেলেদের জন্য সাজে, মেয়েরা তো সাজে অন্য মেয়েদের দেখাবে বলে !  

যাই হোক,সপ্তমীর দিন খুব ভাল করে সাজলাম, অঙ্গে পিওর সিল্ক, কানে ঝুমকো, আঁখিপল্লবে আইলাইনার আর অতি অবশ্যই ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার অর্থাৎ চোখের পাশে ছোট্ট ছোট্ট তারা। আমি গিয়ে পৌঁছলাম সবার আগে, মণ্ডপে বসে আছি, দেখি মৌমিতা আসছে । ও জামদানি পরেছে আর খোঁপায় গোলাপ; হঠাৎ দেখি ওর চোখের কোণে কি যেন….একি!!! ওর চোখের কোণে দেখি ছোট্ট বাঁকা চাঁদ…ক্রিসেন্ট মুন স্টাইলে অর্ধচন্দ্র আঁকা ওর থুতনিতেও।

আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও বললো, “দেখ দেখ, এ হল এখনকার নতুন স্টাইল স্টেটমেন্ট; মুন-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে এঁকেছি এগুলো !!”

আমি যেন থতমত ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, আচ্ছা আমার তো সবাইকে চমকে দেওয়ার কথা ছিল, আমি কেন চমকে যাচ্ছি ! হালকা হেসে বলি, “তুই মনে হয় আমার দিকে ভাল করে তাকাসনি এখনও”।

আমার কথা শুনে ও তাকায় আমার দিকে, এবার বেশ অনেকক্ষণ ধরে…আমি মুচকি হাসি।

“স্ট্যাম্প আইলাইনার বুঝি তুই একাই কিনতে পারিস, এই দেখ আমার ব্র্যান্ড নিউ ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার…এবার কি বলবি?”

“কিন্তু….”

মিষ্টি হেসে ওকে বলি, “তোর কাছে যা থাকতে পারে, তা তো অন্য কারো কাছেও থাকতে পারে, তাই না? অত ভেঙে পড়ার কিছু হয়নি।”

“দেখ দেখি বাকিদের তো এখনো পাত্তা নেই।” বলে ওঠে মৌমিতা। বুঝি প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইছে ও; আমি মনে মনে হাসি…আমি ওর থেকেও বেশি ঘেঁটে গেছি কিন্তু বাইরে স্বাভাবিক থাকি নয়তো আইলাইনার ঘেঁটে যাবে যে !    

ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে সৌমি, ঐশী, স্মিতাক্ষীরা।

“এতক্ষনে তোদের আসার সময় হল?”

“কি করব…সাজতে সাজতে দেরি হয়ে গেল।” খুব ঘাড় বেঁকিয়ে বলল ঐশী।

দেখি ঐশীও খুব মাঞ্জা দিয়ে সেজেছে, একটা সাদা শার্ট আর রঙিন জয়পুরি ধাঁচের ঘাগরা, তাতে আবার কাঁচের কাজ!

পাশ থেকে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “ঐশীকে দেখ, গলায় কিসব গুজরাটি ট্যাটু, থুতনিতে সূর্য।”

“ওরে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে কি বলছিস…দেখ দেখ, এসব সব স্ট্যাম্প আইলাইনারের কামাল! আমার থুতনিতে যে ছোট্ট সূর্যটা দেখছিস ওটা সান-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে করেছি…আর গলায় যে একসারি ছোট ছোট ষ্টার দেখছিস ওটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারের কাজ; একটা করে জাস্ট স্ট্যাম্প মেরেছি; আগে দেখেছিস কখনও?” ঐশী এমন ফর্মে কথাগুল ছুঁড়লো যেন ও মেরিলিন মনরো আর আমরা আতিপাতি। আমার খুব রাগ হল। ভাবছি ওকে গাড্ডায় ফেলি কি করে, দেখি আমার আগে সৌমিই সেই কাজটা করে দিল।
“আচ্ছা ঐশী, আমি তো দেখছি তুই একা নয়, জেনি আর মৌমিও তো স্ট্যাম্প আইলাইনার পরেছে!” সৌমি বলে ওঠে। আমরা দু’জন আত্মবিশ্বাসে ভোর করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, “দেখো হিরোইন, আমরাও স্ট্যাম্প আইলাইনার লাগিয়েছি…কোনো বক্তব্য আছে?”

এবার কেঁদে ফেলার জোগাড় ঐশীর ! ওর কান্ড দেখে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠি।
“আরে কাঁদিস না, কাঁদিস না, আইলাইনার সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে যে…” অনেক কষ্টে যখন আমরা ওকে শান্ত করলাম, তখন আর ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় হাতে নেই; বৃষ্টি এসে গেছে প্রচন্ড জোরে ! অগত্যা, মণ্ডপেই গল্প জুড়লাম আমরা !!

আজ যখন ষ্টার-সান-মুন-হার্ট-বো-কিউপিড-অ্যারো আরও কতধরনের স্ট্যাম্প দেখি, সেসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে।সেদিনের কথা আজ মনে পড়লে আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠি। সত্যি এই জন্যই বোধহয় লোকে বলে, “বাপেরও বাপ্ আছে”।।

©জয়ী