চিরন্তন নই

হে প্রিয়,

শুধু এটুকু মনে রেখো যে আমরা চিরন্তন নই,

চাঁদ-সূর্য চিরন্তন, ঝড়-বৃষ্টি চিরন্তন,

পর্বতের মাথায় লালরঙা সূর্যোদয়, নদীর বুকে পাথর, পাখির পরিত্যক্ত বাসা চিরন্তন,

চিরন্তন এমনকি আমাদের দুঃখের জীবনযাপনটুকুও,

তবু আমরা চিরন্তন নই, হব না কোনওদিন…

আমাদের গল্পটা রোজনামচা হওয়ার আগে, অভ্যাস হয়ে ওঠার আগে,
প্রাত্যহিক হয়ে ওঠার আগেই ভেঙে দেব সব,

ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমাদের যৌবনযাপন, প্রিয় আসবাব,

ফেলে দেব রঙিন পালক, পুঁতির হার, বইয়ের ভাঁজে শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপ,

কোনও খবর রাখব না তোমার প্রিয় বাঁশির, দেয়ালে ঝোলানো বাবুইয়ের বাসাটার,

যাওয়ার আগে ঝোলায় পুরে নেব আদরের “গীতবিতান”, মনভোলানো “সঞ্চয়িতা”

তোমার জন্য রেখে যাব “কালের মন্দিরা”, শঙ্খিনীর উপাখ্যান,

রেখে যাব গোধূলির শেষ আলোটুকু,

রেখে যাব মেঘলাদিনের শেষ বৃষ্টিটুকু!!

তাই তোমার আমার আর রূপকথা হওয়া হবে না,

আমি মুহূর্ততেই বেঁচে নেব সবটুকু বাঁচা,

মনে রাখব বসন্ত উৎসব, হলুদ-গোলাপি আবিরের লোকনৃত্য

মনে রাখব অষ্টমীর সকালের নরম রোদ, একসাথে অঞ্জলি,

মনে রাখব রবীন্দ্রজয়ন্তীতে করা প্রেম,

হিন্দোলযাত্রায় একসাথে চলা,   

মনখারাপি আষাঢ়ে বর্ষামঙ্গল শোনা…

তাই আমাদের গল্পটা ডাল-আলুপোস্ত হওয়ার আগে,

মাছবাজার হওয়ার আগে, সংসার হয়ে ওঠার আগে

ভুলে যাব এই প্রেমযাপন, এই বৃষ্টিভেজা, এই গঙ্গার হাওয়া!!

তোমায় মনে করব কালবৈশাখীতে

মনে করব শেষবিকেলের কমলা আলোয়, কোনএক নবমীর সকালে,    

মনে রাখব গ্রিক ট্র্যাজেডিতে,

মনে রাখব নর্ডিক রূপকথায়,

মনে রাখব গিটারের স্বরে,

তবু আমাদের গল্পটাকে কিছুতেই প্রাত্যহিক হতে দেব না!!

 

©জয়ী 

আজ “ক” নিয়ে কাব্যি হোক

কুন্দনন্দিনী কাঞ্জীভরম আর কানবালায় সুসজ্জিত হয়ে চলল কাঞ্চিপুরমের কমলাক্ষ্মী মন্দিরে পুজো দিতে। কিঞ্জল কান্তিবিদ্যা চর্চা করছে সেই কান্তারমরুর দেশে। আর কল্কিনারায়ণের বাড়িতে তখন কলাবৌ স্নানের তোড়জোড়। কনিষ্ক বসে বসে কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড পড়ছে। কৌশল্যা কোষাকুষি নিয়ে ব্যস্ত। কমল কলাপাতা কাটতে গেছে। কমলিনী আর কুন্দন কষ্টিপাথরের খোঁজ করছে। কোকিলকন্ঠী কৌশিকী কোকনদ ফোটানোয় ব্যস্ত। কাকাতুয়া ‘কোজাগরী’ ঘাড় বেঁকিয়ে সবকিছু পরখ করছে। কৈলাশেশ্বরীর পূজা চলছে কিন্তু কেউ এতটুকুও কুশল বিনিময় করছে না। সকলেই কালের কণাদে মনোনিবেশ করেছে।

অন্যদিকে কৌশানী কংসের কারাগার, কেদারনাথধাম, কনখল ঘুরে এখন কাশীতে এসেছে। কাশীশ্বরকে পুজো দিয়ে ও কচৌরি গলিতে ঢুকল কচুরি খেতে। কমলাভোগ ওর খুব প্রিয়। কেশরীজির কুঠী হল ওর কাশীর আস্তানা। কাশীতে ওর পরিচয় হয়েছে কিয়েভবাসী কেভিনের সঙ্গে; কেভিন কাঠিয়াবাবার শিষ্য।

কৃষ্ণরাজ এখন কলকাতা ছেড়ে অনেকদূরে, সুদূর কাবুলে। কষা মাংস আর কবিরাজী খায়নি অনেকদিন হল। কিয়ারার সান্নিধ্যেও কঙ্কাবতীকে এতটুকু ভোলেনি ও। কঙ্কাবতী এদিকে কার্ডিফে বসে কাস্টার্ড খাচ্ছে। কৃশান্যা, কৌমুদী, কর্ণিকরা কস্মিনকালেও কল্কিবাড়িতে পুজো দেখতে আসেনি; কেশব কাজিরাঙা বেড়াতে গেছে; কানাইলাল কাজু, কিসমিস, কেসর সহযোগে কাশ্মীরী পোলাও রাঁধতে ব্যস্ত । এরা সকলেই কল্কিবাড়ির সদস্য ! সৌভাগ্য/দুর্ভাগ্যবশত একমাত্র সেটিই এখন যোগাযোগের সুতো।

চোখের তারায় আয়না ধরো

আমার কৈশোরে এমি ওয়াইনহাউসেকে দেখেই প্রথম জেনেছিলাম winged eyeliner বা ডানাওয়ালা আইলাইনার আসলে কি বস্তু; অবশ্য সত্তর আশির দশকের নায়িকারাও এভাবেই তাদের আঁখিপাতাকে সাজাত। আমি যে সময়টায় পনেরো-ষোলো তখন সবাই ওই আইলাইনারই লাগত, কখনও বা ইচ্ছে হলে একটু মাস্কারা, এর বেশি কিছু পরার চল ছিলনা, অন্তত টিনএজের মেয়েদের মধ্যে। এখন যখন দেখি সব বাচ্চা মেয়েরা কি নিরুপদ্রবে আইভ্রু পর্যন্ত এঁকে নিচ্ছে আইভ্রু লাইনার দিয়ে , তখন হিংসে তো হয়ই।

আমি তখন সবে মাত্র ষোলো। আইলাইনার, কাজল, মাস্কারা কিছুই ব্যবহার করি না, শুধু কোনো নিমন্ত্রণ থাকলে একটু আইলাইনার লাগাতাম। এসবের মধ্যেই হঠাৎ গোল বাঁধল একটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারকে কেন্দ্র করে; আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া আমাকে একটি ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার উপহার দিলেন…তখন পর্যন্ত ওই বস্তুটি কি, খায় না মাথায় দেয় আমিতো তাও জানতাম না; কিন্তু উনি ব্যবহার করা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। যেভাবে আমরা সাদা কাগজে স্ট্যাম্প মারি কালি দিয়ে , ঠিক তেমনি! এখানে স্ট্যাম্প হল ওই সরু আইলাইনারের মুখে লাগান একটা ছোট্ট তারা, আর বোতাম টিপলে ভিতর থেকে কালি আসবে…ব্যাস, এবার চোখের কোণে, গালে, থুতনিতে যেখানে ইচ্ছে ষ্টার স্ট্যাম্প মেরে নিলেই হল। অনেকে কাজল পেন্সিল দিয়ে চোখের পশে উল্কি আঁকে, আর এ হল রেডিমেড উল্কি, অনেক বেশি সূক্ষ্য, নিখুঁত আর শুধু একটি স্ট্যাম্প দিলেই কেল্লাফতে! কি সুন্দর চোখের পলকে ষ্টার ছাপ পড়ে যেত, দেখেই ভাল লাগত।

আমি ঠিক করলাম এটা পরে বন্ধুদের চমকে দিতে হবে, কিন্তু স্কুলে তো আর ওসব পরে যাওয়া সম্ভব নয়! স্কুলে তখন প্রায়ই নখ চেক হত, আর সেখানে আইলাইনার পরে গেলে তো আর রক্ষে নেই। তো আমি বন্ধুদের চমকে দেওয়ার জন্য দুর্গাপুজোর সপ্তমী বাছলাম। ঠিক হল ঐদিন বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখব। কাউকে ঘুণাক্ষরেও আমার এই আইলাইনারের কথা বললাম না, স্কুলে যথারীতি পুজোর ছুটি পড়ে গেল আর আমি অপেক্ষায় থাকলাম কবে ওই ডানাওয়ালা আইলাইনার আঁকব, ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে নিজেকে সাজাব আর আমার বন্ধুরা আমাকে দেখে চমকে যাবে। মেয়েরা কি আর শুধু ছেলেদের জন্য সাজে, মেয়েরা তো সাজে অন্য মেয়েদের দেখাবে বলে !  

যাই হোক,সপ্তমীর দিন খুব ভাল করে সাজলাম, অঙ্গে পিওর সিল্ক, কানে ঝুমকো, আঁখিপল্লবে আইলাইনার আর অতি অবশ্যই ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার অর্থাৎ চোখের পাশে ছোট্ট ছোট্ট তারা। আমি গিয়ে পৌঁছলাম সবার আগে, মণ্ডপে বসে আছি, দেখি মৌমিতা আসছে । ও জামদানি পরেছে আর খোঁপায় গোলাপ; হঠাৎ দেখি ওর চোখের কোণে কি যেন….একি!!! ওর চোখের কোণে দেখি ছোট্ট বাঁকা চাঁদ…ক্রিসেন্ট মুন স্টাইলে অর্ধচন্দ্র আঁকা ওর থুতনিতেও।

আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও বললো, “দেখ দেখ, এ হল এখনকার নতুন স্টাইল স্টেটমেন্ট; মুন-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে এঁকেছি এগুলো !!”

আমি যেন থতমত ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, আচ্ছা আমার তো সবাইকে চমকে দেওয়ার কথা ছিল, আমি কেন চমকে যাচ্ছি ! হালকা হেসে বলি, “তুই মনে হয় আমার দিকে ভাল করে তাকাসনি এখনও”।

আমার কথা শুনে ও তাকায় আমার দিকে, এবার বেশ অনেকক্ষণ ধরে…আমি মুচকি হাসি।

“স্ট্যাম্প আইলাইনার বুঝি তুই একাই কিনতে পারিস, এই দেখ আমার ব্র্যান্ড নিউ ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার…এবার কি বলবি?”

“কিন্তু….”

মিষ্টি হেসে ওকে বলি, “তোর কাছে যা থাকতে পারে, তা তো অন্য কারো কাছেও থাকতে পারে, তাই না? অত ভেঙে পড়ার কিছু হয়নি।”

“দেখ দেখি বাকিদের তো এখনো পাত্তা নেই।” বলে ওঠে মৌমিতা। বুঝি প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইছে ও; আমি মনে মনে হাসি…আমি ওর থেকেও বেশি ঘেঁটে গেছি কিন্তু বাইরে স্বাভাবিক থাকি নয়তো আইলাইনার ঘেঁটে যাবে যে !    

ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে সৌমি, ঐশী, স্মিতাক্ষীরা।

“এতক্ষনে তোদের আসার সময় হল?”

“কি করব…সাজতে সাজতে দেরি হয়ে গেল।” খুব ঘাড় বেঁকিয়ে বলল ঐশী।

দেখি ঐশীও খুব মাঞ্জা দিয়ে সেজেছে, একটা সাদা শার্ট আর রঙিন জয়পুরি ধাঁচের ঘাগরা, তাতে আবার কাঁচের কাজ!

পাশ থেকে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “ঐশীকে দেখ, গলায় কিসব গুজরাটি ট্যাটু, থুতনিতে সূর্য।”

“ওরে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে কি বলছিস…দেখ দেখ, এসব সব স্ট্যাম্প আইলাইনারের কামাল! আমার থুতনিতে যে ছোট্ট সূর্যটা দেখছিস ওটা সান-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে করেছি…আর গলায় যে একসারি ছোট ছোট ষ্টার দেখছিস ওটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারের কাজ; একটা করে জাস্ট স্ট্যাম্প মেরেছি; আগে দেখেছিস কখনও?” ঐশী এমন ফর্মে কথাগুল ছুঁড়লো যেন ও মেরিলিন মনরো আর আমরা আতিপাতি। আমার খুব রাগ হল। ভাবছি ওকে গাড্ডায় ফেলি কি করে, দেখি আমার আগে সৌমিই সেই কাজটা করে দিল।
“আচ্ছা ঐশী, আমি তো দেখছি তুই একা নয়, জেনি আর মৌমিও তো স্ট্যাম্প আইলাইনার পরেছে!” সৌমি বলে ওঠে। আমরা দু’জন আত্মবিশ্বাসে ভোর করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, “দেখো হিরোইন, আমরাও স্ট্যাম্প আইলাইনার লাগিয়েছি…কোনো বক্তব্য আছে?”

এবার কেঁদে ফেলার জোগাড় ঐশীর ! ওর কান্ড দেখে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠি।
“আরে কাঁদিস না, কাঁদিস না, আইলাইনার সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে যে…” অনেক কষ্টে যখন আমরা ওকে শান্ত করলাম, তখন আর ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় হাতে নেই; বৃষ্টি এসে গেছে প্রচন্ড জোরে ! অগত্যা, মণ্ডপেই গল্প জুড়লাম আমরা !!

আজ যখন ষ্টার-সান-মুন-হার্ট-বো-কিউপিড-অ্যারো আরও কতধরনের স্ট্যাম্প দেখি, সেসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে।সেদিনের কথা আজ মনে পড়লে আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠি। সত্যি এই জন্যই বোধহয় লোকে বলে, “বাপেরও বাপ্ আছে”।।

©জয়ী

কোনএক একাকিনীর কথা

আমি তো আজ বেলফুলের মালা গাঁথি,

সেই মালায় সাজাই বেণী,

সেই সুবাসে করি নিজেকে উজাড়;

কখনও বা একমুঠো রঙ্গনফুল তুলে আনি

ছড়িয়ে দিই বিছানায়

একমুঠো শিউলি পেলে রেখে দিই বাটিতে

সুগন্ধে ভরে ওঠে জীবন;

আজও খোঁপা সাজাই স্বর্ণচাঁপায়, কখনও বা সূর্যমুখী,

আসবে না জানি…তবু,

তোমার চোখে নিজেকে দেখতে ভাল লাগে, খুউউব…

দোরের মুখে করতে বসি গাঁদার রঙ্গোলি,

কোনও অতিথি আসবে না জানি,

তবু কেউ আসবে ভাবতে ভালবাসি,

আসলে এসব কিছু করে নিজেকে খুঁজে পাই।

হয়তো ছিঁড়ে ফেলব বলেই লিখে ফেলি তোমাকে চিঠি,

সেই চিঠির প্রতি ছত্রে লিখি তোমার নাম,

হয়তো বা বৈষ্ণব পদাবলীর উপমা…

কেউ পড়বে না জানি, তবুও লিখতে ইচ্ছে হয় খুব,

কৈশোরপ্রেমের কথা,

উল্কাবৃষ্টির কথা,

আমার প্রথম সোনারদুল হারানো,

ঠাকুরমার দেওয়া কানবালা,

পুরীর মন্দিরের লাস্যময়ী পূজারিণী,

বিষ্ণুর দশাবতারের কথা,

অস্সিঘাটের উদাসী বাউলের কথা,

বাড়ির পুরনো তানপুরার কথা,

কোনএক সুপুরুষ শিবভক্তের কথা…

আমার বলতেও ইচ্ছে করে খুব,

যদিও শোনার কেউ নেই,

তবু দেয়ালেরও কান আছে,

এই প্রবাদ মেনে নিয়ে,

ইচ্ছে হয় বলে চলি অনর্গল

আমার প্রথম সর্ষে ইলিশ রাঁধা,

মায়ের বানানো চিতলের মুইঠ্যা,

আমার প্রথম কাজল পরা,

কোনএক সাদা পাঞ্জাবির জন্য অপেক্ষা

তার জন্য কবিতা দেখা,

এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা “ভারততীর্থ”

প্রতিমার থেকেও মণ্ডপসজ্জা দেখে বেশি উৎফুল্ল হওয়া

দোলের দিনের উদ্দাম নৃত্য…

আমার দেখাতেও ইচ্ছে করে খুউউব,

আমি যা দেখি তাই,

যা দেখে আমি উদ্বেলিত হয়ে উঠি,

বাবুঘাটের সূর্যাস্ত,

পরেশনাথ মন্দিরের কারুকার্য,

ভিক্টরিয়ার উদাসীন পরী,

শোভাবাজার রাজবাড়ি…

ইমামবাড়ার সূর্যঘড়ি

ইচ্ছেকরেই নেড়েচেড়ে দেখি,

আমার বানানো গালিচা,

দেওয়ালে ঝোলানো ছবি,

নখের নকশায় আঁকা আজটেক চিত্রকলা   

তবুও দিনের শেষে একাকী থেকে যাই,

আর কিছু হই বা না হই, নিজকাব্যের নায়িকা হই !!

বখাটে ছেলে লালকমলের চিঠি মহাদেবকে

হে শিবশম্ভু,
    আজ কাঁধে কলসীর বাঁক নিয়েছি, টুংটাং ঘণ্টা আর গাঁদা ফুলের মালায় বাঁক সাজিয়েছি। আজ আমার দেওয়া গঙ্গাজলে তুমি তুষ্ট হয়ো। সবাই আমায় যতই মন্দ ছেলে বলুক, দুয়ো দিক, কুৎসা রটাক…তুমি তো জান আমি খারাপ  নই। তুমি তো ভক্তের ভক্ত হে মহাদেব! লোকে বলে আমি নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে তোমার পূজা করি, আমি নাকি মহেশ্বরের চেয়েও গেরুয়া নিশানকে বড় আশ্রয়দাতা মনে করি, আমি নাকি দলে লোক টানতে কাঁওয়ারিয়াদের ভার নিই, জলযাত্রীদের সেবা করি, পুণ্য অর্জন নাকি আমার উদ্দেশ্য নয়, আমার কপালের লালতিলক নাকি আসলে শিবঠাকুরের জন্য নয়, এ আসলে ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
লোকে আমার জামার গেরুয়া রংটাই দেখে, আমার জীবন সংগ্রামটা কেউ দেখেনা, লোকে দেখে রামনবমীর মিছিলে আমি প্রথম সারিতে, আমার হাতে অস্ত্র, কিন্তু এর পিছনে একটা সুস্থ জীবনলাভের যে কি আকুতি, সেটা কারো চোখে পড়ে না।

গতবছর এমনই এক শ্রাবণ ছিল, আকাশ ছিল ঘনকালো, বৃষ্টিপায়ে হেঁটে চলেছিল হাজার পুণ্যার্থী; হঠাৎই তার সাথে এক পলক আমার চোখাচোখি, তার ক্লান্ত মুখ, কাজলকালো চোখ, লাল চুড়িদার যেন উদ্বেলিত করল আমায়, কথা বলে জানলাম তার নাম লালি; সে বলেছিল এই কমলা কুর্তা, সাদা পাজামা আর কপালের লালতিলকে নাকি খুব সুন্দর দেখায় আমায়; কথাটা কতটা সত্যি জানিনা, কিন্তু আজ ঐভাবেই সাজাই নিজেকে। সে আমাকে শুধুই সাবধান করে আমি যেন অস্ত্র হাতে না তুলি, যেন কোন অপ্রীতিকর কিছু না করে বসি; ওকে যে কিভাবে বোঝাই আমি এক্কেবারে মাটির মানুষ; যেটুকু যা করি ওই দাদাদের কোথায় আর দলে টিকে থাকতে! আর অস্ত্র হাতে তুলছি মানেই এমন নয় যে কাউকে আক্রমণ করব, তা শুধুই আত্মরক্ষার্থে।
সেবার বৃষ্টি নামল, প্রথমে ঝিরঝিরিয়ে, তারপর অঝোরধারায়, আমি তখন কাঁওয়ারিয়াদের পুরি, গুজিয়া, শরবত বিতরণে ব্যস্ত…সেই যে বৃষ্টি নামল, কখন থেমেছিল, আমার আর মনে নেই; হয়তো ঘটনার ঘনঘটা আমায় সেটা মনে রাখতে দেয়নি; একদল মাদ্রাসা ফেরত কচিকাঁচাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম আমাদের তাঁবুতে, আর আমার ওপর খেপে উঠেছিল দলের দাদারা। সেবার যখন রুস্তম অসুস্থ হল ওকে রক্ত দিয়েছিল কে? কওসর চাচা অসুস্থ হলে তার পথ্য করে কে? তবুও দিনের শেষে সবাই আঙ্গুল উঁচিয়ে বলে, “লালকমল তো গেরুয়া”। আমার অন্য সব পরিচয় মুছে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়টাই কেন যে সবার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তা আজ বুঝি না; শুধু এটুকু বুঝি মানুষ যখন, কোন একটি ‘তকমা’ তো চাই!

আমি অস্ত্র ধরি, আমি রাহাজানি করি, আবার ভালোও বাসি। অপরাধ করা আমার জীবিকা বটে কিন্তু আমি একেবারে নিরপরাধী। আমার সব অপরাধ তুমি ধুয়ে দিও। আমি উড়োনচন্ডী, বাউণ্ডুলে, আত্মভোলা, আমি কষ্ট ভুলতে গাঁজা টানি। কিন্তু লালিকে ছাড়া আমি বাঁচব না! হরগৌরীর মিলন যেমন চিরন্তন, আমি আর লালি যেন সেভাবেই চিরকাল একসাথে থাকতে পারি! তুমি একটু দেখো।
পুনশ্চ: লালপাঞ্জাবি আর সাদা ধুতিতে আমি তো সেই পাশের বাড়ির ছেলে, যে পাড়ার পুজোর মধ্যমনি, যার মধ্যে আছে হাস্যরস আর অন্যের দুঃখ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিকতা; তার তো আলাদা কোন ধর্ম নেই, ভেদাভেদ নেই…সে যদি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তার কি অন্য পরিচয়গুলো মুছে যায়?
ব্যোম্ ভোলে! ভোলেবাবা পার করো !
ইতি,
তোমার বখাটে ছেলে লালকমল

©জয়ী