একটি শীতবস্ত্রের উপাখ্যান

একটি শীতবস্ত্রের উপাখ্যান

©জয়ী সামসুল

কলকাতার বাতাসে তখন সুইট নভেম্বরের বিষাদ সুর। আমার মন জুড়ে কোল্ডক্রিম, কড়াইশুঁটির কচুরি আর নলেন গুড়ের সুঘ্রাণ। এমনই এক নভেম্বরি বিকেলে, ঢিমে আঁচের রোদকে সঙ্গী করে আমি গেলাম সোয়েটার কিনতে। টার্টলনেক সোয়েটার, স্কার্ফওলা সোয়েটার, কুইল্টেড কোট, হরেকরকম জ্যাকেট দেখার পর যখন আমার চোখে পড়ল হলদেটে বাদামিরঙের একটা ওভারসাইজড wrapকোট, তাতে আবার ভেলভেটের নক্সা করা। কলারটাও খুব সুন্দর ভিকটোরিয়ান ধাঁচের। দাম দেখে ছিকটে এলাম বটে কিন্তু ওই wrapকোটের আভিজাত্য দেখে ঠিক করে ফেললাম এটা কিনতে হবে। তখন কলেজের দ্বিতীয়বর্ষ, হাতে পয়সাকড়িও বেশী নেই। আমার প্রেমিকপ্রবর পাবলো তখন প্রায়ই সাদা একটা হুডি পরে কলেজে আসত। সেটার সামনে আবার বড় বড় করে লেখা ছিল, “ডু নট রিড দ্য নেক্সট লাইন”; তারপর খুব ছোটছোট করে লেখা “ইউ আর আ রেবেল, আই লাইক ইউ।” ওটা দেখে আমারও খুব সাদা হুডি কেনার ইচ্ছে হতো। কিন্তু এই বাদামি কোটটা দেখার পর থেকে সাদা হুডি কিংবা সোয়েটার কেনার ইচ্ছে উবে গিয়ে ওটা পাবার ইচ্ছেই মূর্ত হয়ে উঠল। পাবলোকে সেই কথা বলতে ও মাথা চুলকে বলল, “উপায় একটা আছে। তুমি কি রাজি হবে?” আমি কোনোরকম চিন্তা না করেই বললাম, “বল বল…রাজি হব না কেন?”

পাবলো বলল, “আমরা দু’জনে মিলে ওই কোট কিনে ফেলতেই পারি।” ওর ফান্ডা আমারও খুব ভাল লাগল।  সেইমতো আমরা আমাদের দু’জনের টাকা মিলিয়ে কিনে ফেললাম সেই লম্বা, দীর্ঘায়িত কলারওয়ালা বাদামি কোট। ঠিক হল দু’জনেই ওটা পরব সময় সুযোগমতো। আমি কোথাও বেড়াতে গেলে বা নেমন্তন্নবাড়ি গেলে পরব, ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে কোথাও গেলে কিংবা রেস্তোঁরাতে খেতে গেলে পরবে। কেনার পর ও বলল, “আপাতত তুমি এটাকে বাড়ি নিয়ে যাও, দরকার হলে আমি চেয়ে নেব।” সেদিন আমার আনন্দ দেখে কে। বাড়ি ফিরে খুব যত্ন করে আমার সদ্য কেনা wrapকোট তুলে রাখলাম। বাড়িতে দামের ব্যাপারটা চেপে গেলাম। এরপর একদিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছি ওই কোট পরে। ওই আত্মীয়া প্রথমে অত খেয়াল করেননি, কিন্তু আমাকে ছোট্ট একটা প্লেটে পেস্ট্রি এগিয়ে দিতে গিয়ে ওঁর নজরে পড়ল আমার বাদামি ভিকটোরিয়ান কোট। উনি আরেকটু হলেই প্লেটটি আমার গায়ে ফেলে দিতেন। শেষে নিজেকে সামলে নিয়ে গল্প করতে লাগলেন। ওনার মেয়ের গল্প, ইউরোপে কতটা ঠান্ডা পড়ল, তাতে কলকাতার কি এসে গেল এই জাতীয় সব আগডুম বাগডুম গল্প শুনতে বিরক্ত লাগলেও শুনতে হল। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি মা’ও ওনার গল্প শুনে হাসছে। যাই হোক আমি বুঝলাম যে এই কোট পরলে সবাই আমাকে নিয়ে একটু উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে। আসলে এই কোট পরলে যে কোন ব্যক্তিকেই হেলাফেলা ভাবা মুশকিল। কোট বাবাজী’র কান্ড দেখে আমার ভীষণ গর্ব হল। এদিকে শ্রীমানকে এই কথা বলতে সে তো হেসে লুটোপুটি।

আমাদের মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি ছিল যে আমরা দু’জন যখন একসাথে বেরোব তখন আমরা রোটেশন করে কোট পরব, মানে একদিন আমি পরলে পরদিন ও। যে দিনগুলোতে ও কোট পরবে সেদিনগুলোতে পরার জন্য আমি এসপ্ল্যানেড থেকে একটা সস্তার পিচরঙা পুলওভার কিনেছিলাম। একদিন আমরা একটা কফিশপে গেছি, হঠাৎই পাবলো অসাবধানতাবসত টেবিলে কফি উল্টে ফেলল আর সেই কফি ছলকে গিয়ে কোটে লাগল। আমার খুব রাগ হল, ওকে বকাবকি করলাম, রুমাল দিয়ে তখনকার মতো কফি মুছে দিলাম কিন্তু একটু দাগ সেই থেকেই গেল। তখন ভেবেছিলাম বাদামি কোট, বাদামি কফি অত বোঝা যাবে না। কিন্তু পরে দেখলাম একটু হলেও দাগটা বোঝা যাচ্ছে।
এই ঘটনার দিন দশেক পর আমি একটা অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানে আদরের কোটটা পরে গেলাম। এবং খেতে গিয়ে খুব সুন্দরভাবে আমার রাজকীয় বাদামি কোটে মোমোর সুপ্ ঢেলে ফেললাম। সুপ্ যদিও ট্যালট্যালে হয়, কিন্তু আমি আবার সুপের মধ্যে সস মিশিয়ে নিয়েছিলাম। ফলত, শখের কোটের যে কি অবস্থা হল তা বলাই বাহুল্য। আমার রীতিমতো কান্না পাচ্ছিল; তবু কোনোরকমে কান্না চেপে বাড়ি ফিরে গেলাম। সেদিন রাতেই ওই সসের দাগ তা ডিটারজেন্ট দিয়ে ওঠালাম। ঠিক করলাম একবার ড্রাইওয়াশ করিয়ে নেব। সেদিন ও কফি ঢেলে ফেলায় অত রাগ করেছিলাম বলেই বোধহয় আমার নিজের হাত দিয়ে সুপ্ উল্টে গেল।
এই কথা ওকে বলতেই পাবলো প্রথমে ছদ্ম রাগ দেখাল, তারপর হো হো করে হাসতে লাগল; দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, “দেখ, দেখ…আমায় বলছিলে না আমি বাচ্চাদের মতো কফি উল্টে ফেলেছি…”। আমি আর কি করব…নিজের ওপর রাগটা সম্বরণ করে হাসিতে যোগ দিলাম। ড্রাইওয়াশ করতে ভালই খসেছিল, কোটটিও আগের অবস্থায় ফিরে এসেছিল। এরপর একদিন কলেজে ফেস্ট আর সাথে আমাদের ইয়াব্বড় অ্যাসাইনমেন্ট। আমি বাড়িতে বসে অ্যাসাইনমেন্ট লিখছি আর পাবলো ফেস্ট এ গেছে। আমি লিখে লিখেও কিছুতে শেষ করতে পারছিনা আর তিনি ওখানে নাচানাচি করছেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল কোট তখন ওনার জিম্মায়। ঠিক আছে, সেই নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই; কোট তো দু’জনেরই। পরদিন সকালে যখন কলেজে গেছি দেখি সবাই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে মরিয়া। পাবলো সেদিনও অনেক দেরি করে কলেজে এল। ও এসে বলল ঘুম থেকে উঠতে নাকি দেরি হয়ে গেছিল। যদিও আমি দেরিতে আসার আসল কারণ জানতাম। আগের দিন অত নাচানাচি করলে কলেজে আসতে দেরিতো হবেই। যাই হোক ওকে আমার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিলাম আর ও সেটা দেখে টুকেও নিল। সেদিন বিকেলে কোট ফেরত দিল ও। আমি তো কোট নিয়ে বাড়ি চলে গেছি; তুলে রাখতে গিয়েও ভাবলাম একবার পকেটগুলো দেখি তো, যেন ভারী ভারী লাগছে।
হাত দিয়ে দেখি বাঁদিকের পকেটে একটা কিংসাইজের চকলেট বার। বুঝলাম ওই নাচানাচির জন্য আমাকে ঘুষ দেওয়া হয়েছে যাতে বেশী রাগারাগি না করি। আমি উপহার দেওয়ার ধরণ দেখে খুশি হলাম; আমি এমনিতেই চকোলেটের পোকা, তার ওপর সেটা বেরিয়েছে প্রিয় কোটের পকেট থেকে। ঠিক যেমন মোজার মধ্যে থেকে উপহার পেলে বড়োদিনে বাচ্চারা খুশি হয়। ঠিক করলাম আমিও কিছু রেখে দেব ওই কোটের পকেটের ভেতরে। আমি ওকে এককৌটো সল্টেড কাজুবাদাম দিয়েছিলাম। এভাবেই আমরা শীতকাল জুড়ে ওই কোটের পকেটে করে চিঠি, ফুল, কুকিজ, চকোলেট, বাদাম, ছোট্ট টেডি, প্রচ্ছন্ন হুমকি…না জানি আরও কত কি চালাচালি করেছিলাম।

আমাদের জীবন যেমন এক সোয়েটার থেকে অন্য সোয়েটারে বয়ে যায়, সম্পর্কও তাই। কোটেরও ভেলভেট মলিন হল, কলারে ধুলো জমল, একটা বোতাম খসে পড়ল। বোতাম যদিও সেলাই করে নিয়েছিলাম, পাবলোর সাথে সম্পর্কটাকে সেলাই করতে পারিনি। আমি তো আর বাবুই পাখি নই। তাই আমার সাধের কোট যেদিন দর্শিনীকে পরতে দেখলাম, মনে হচ্ছিল কোটটা নিয়ে ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দিই; গাড়ি চলে যাক ওটার ওপর দিয়ে, পৃষ্ঠ হোক পদাঘাতে। প্রসঙ্গত, তখন আমাদের সংঘাত চরমে। কথা কাটাকাটি চলছে খুব, মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আসলে আমাদের মধ্যে যত ঝগড়া, তত গলায় গলায় ভাব। ওরকম প্রায়ই হত; তাই আমিও অত মাথায় ঘামাইনি। সেদিন ঝগড়াটা শুরু হয়েছিল সামান্য খুনসুটি দিয়ে।

পাবলোকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাদের কোট দর্শিনী পরেছিল কেন?” ও দেখলাম স্বাভাবিক গলায় বলল, “গতকাল আমরা লাইব্রেরিতে বসে নোটস বানাচ্ছিলাম। ফেরার সময় দর্শিনী বলল ও সোয়েটার আনতে ভুলে গেছে। রাতের দিকে শীতটাও  একটু বেড়েছিল, তাই ওকে পরতে দিয়েছিলাম।” পাবলোর কথা শুনে আমার ভারী রাগ হল। আমাদের সোয়েটার দর্শিনীকে পরতে দিয়েছে, আবার কোনো অনুশোচনাও নেই। বললাম, “ওটা তুই রেখে দে, আমার আর চাইনা। যখন ইচ্ছে, যাকে খুশি পরতে দিবি।”
“আরে রাগ করছ কেন? সেদিন আমার তো একটা জ্যাকেট ছিল; ও বেচারি হালকা কটনের শার্ট পরেছিল…”
“ভাবছি তোমার একটা নতুন নাম দেব…’উপকারের দেবতা’।” আমি মুখে এটা বললাম বটে কিন্তু মনে মনে খুব রাগ হল দর্শিনীর ওপর। আমার বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে কোটটা নিয়েছিল। এরপর থেকে আমি সেই কোট আর কোনোদিন পরিনি। পরতে ইচ্ছে হয়নি। কোটটাও পুরোনো হয়ে এসেছিল। পাবলোর কাছেই ওটা বেশিরভাগ সময় থাকত।
কিছুদিন পর আমি সপরিবারে কার্সিয়াঙে বেড়াতে গেলাম। বন্ধুত্ব হল নিশা ছেত্রীর সঙ্গে। বছর সতেরোর মেয়েটি হোটেলের গাছগুলোর পরিচর্যা করতে আসত প্রতিদিন সকালে। তার পরনে বরাবর একটা জীর্ণ রংচটা খয়েরি সোয়েটার। নিশাকে বললাম, “আমার কাছে একটা উলের কোট আছে। তুই নিবি?” নিশাকে ঘরে নিয়ে এসে কোটটা দেখলাম। ও নিতে একটু ইতস্তত করছিল; কিন্তু আমি যখন কোট ওর গায়ে জড়িয়ে দিলাম, ওর মুখে সে কি অপার্থিব হাসি। সেই প্রথম কারো মুখে হাসি ফুটিয়ে মনে মনে গর্ববোধ করলাম। নিশা বলল, “দিদি, তোমার অন্য সোয়েটার আছে তো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ রে, এই তো তোদের কার্সিয়াং থেকে কিনে নিয়েছি।” আসলে বাচ্চা মেয়েটা ঠান্ডায় কাঁপতো, সেটা আমার ভাল লাগত না। পাবলোকে ফোন করে একথা বলতেই ও খিলখিলিয়ে হেসে বলল, “উপকারের দেবী যখন দিয়েছে, আমার আর কি বলার থাকতে পারে।” বুঝলাম, ও কথাটা অভিমানের সুরে বলল। ওই কোট জুড়ে আমাদের দু’জনের কত স্মৃতি; তাই কোট কাউকে দান করে দেওয়াটা ওর ভাল লাগেনি। তাই ওর অভিমানে প্রলেপ দিতে বললাম, “আমরা খুব সুন্দর দেখে একটা কুইল্টেড জ্যাকেট কিনব এরপর।”
দুর্ভাগ্যবশত সেটা আর হয়ে ওঠেনি। একটা কোট কিংবা সোয়েটার ভাগাভাগি করে পরা তো দূরের কথা, একসাথে নন্দন যাওয়া বা কফিশপে বসাও হয়নি। ও চাকরিসূত্রে অন্যশহরে চলে গেল আমি কার্সিয়াং থেকে ফেরার আগেই, কিছুদিন পর আমিও কলকাতা ছাড়লাম ওই একই কারণে। প্রতিবার শীতকাল এলেই আমি ঠিক করি একটা সুন্দর দেখে সোয়েটার কিনব। আজকে ভাবি ওই কোটটা যদি নিশাকে না দিতাম, আমার কলেজপ্রেমের একটা স্মৃতি অন্তত থেকে যেত। পাবলোর অভিমানটা আজকে বুঝি, কিন্তু এখন যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

বিঃ দ্রঃ : গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক; কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।  

Advertisements

লক্ষ্মীমন্তঃ

লক্ষ্মীমন্তঃ—

খয়েরি চুলের টুকটুকে ফর্সা পদ্মপ্রিয়া। বয়স সতেরো পেরিয়ে আটেরোতে পড়েছে। ছোটখাটো চেহারা। সারা বাড়িময় উড়ে বেড়ায় প্রজাপতির মত। যদিও সে একেবারেই লক্ষ্মীছাড়া, কোনো ঘরের কাজ ঠিকমত পারেনা, পারে শুধু খেতে, ঘুমতে, তীব্রবেগে বাহন ছোটাতে, ই-বুক পড়তে আর একটুকরো কাগজ পেলেই তাতে আঁকতে। ওর আঁকার হাত খুব ভাল। তবু দুরন্তপনার জন্য ঠাকুরমা কোনোদিন ওকে আলপনা আঁকতে দেয় না। পদ্মপ্রিয়া মনে মনে হাসে। কাল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ও বেশ কয়েকটা লক্ষ্মীর পট এঁকেছে। সেগুলো যথাসময়ে পৌঁছেও গেছে ওর বন্ধুদের বাড়ি। ও সকাল সকাল উঠে পুজোর জোগাড় করলে বসল একটা লাল কুর্তি পরে আর ঠাকুমা গজগজ করতে লাগলেন, “আঠেরো বছর হয়ে গেল, এখনো শাড়ি পড়তে শিখল না। উনি চুল রঙ করে, গলায় ফাঁস দেওয়ার মতো হার পরে, একপায়ে নুপুর পরে সাজের বাহার করছেন। এই মেয়ে কোনোদিন লক্ষ্মীমন্ত হবে না।”

পদ্মপ্রিয়া ভাবল ঠাকুমা বকবক করতে থাকুক, মা যখন নাড়ুগুলো বানিয়েই ফেলেছে, আমি যাই একবাক্স আলাদা করে রেখে দেই। যেমন ভাবা তেমনি কাজ; ও উঠে গেল প্রসাদ সাজানোর ছুতোয়। তারপর কিছুক্ষন আর ও ঠাকুমার কাছে আসেনি।        

লক্ষ্মীঠাকুর আনতে যাওয়ার কথা উঠতেই ঠাকুমা বেঁকে বসল, “থাক বাছা, তুমি যা লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে, তুমি আর লক্ষ্মীঠাকুর আনার কাজটা নাই বা করলে। ওসব আমার নাতিরা ঠিক সামলে নেবে। পদ্মপ্রিয়ার দুই দাদা তখন ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পদ্মপ্রিয়ার মনে হল এই হাসি অর্থপূর্ণ, যদিও মুখে কিছু বলল না।
পুজোর সময় পদ্মপ্রিয়া সেজেগুজে এসে দেখে তার আঁকা একটা পট বসানো হয়েছে, যেখানে লক্ষ্মীঠাকুর বসানোর কথা ছিল, ঠিক সেখানে। তবে কি এবার পটে আঁকা লক্ষ্মী পুজো হবে? এরকম তো আগে কখনো হয়নি !

“এস ম্যাডাম, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।” বলে ওঠে ছোড়দা।

“সারপ্রাইজ? কি জন্য? দাদা তোরা ঠাকুর আনতে যাসনি? এখানে তো পট…” পদ্মপ্রিয়ার দু’চোখে তখন বিস্ময়।

তুই চলে গেলি সাজুগুজু করতে আর ঠাকুমা কাঁসার বাসন নামাতে গিয়ে আবিষ্কার করল তোর পটে আঁকা লক্ষ্মী। দেখে ঠাকুমার এতো ভাল লাগল যে ঠিক হল এবার ওই পটের মা’লক্ষ্মীকেই পুজো করব আমরা।
“কিন্তু তাহলে বাড়ির ঐতিহ্যের কি হবে? কতকাল ধরে তো…”

ওকে থামিয়ে দিয়ে ঠাকুমা বলল, “সে তোকে ভাবতে হবে না। আমার লক্ষ্মীমন্ত নাতনির জন্য সেসব মঞ্জুর”।   

আনন্দে চোখে জল এল পদ্মপ্রিয়ার, ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ঠাকুমাকে। ঠাকুমা নাতনির মাথায় স্নেহচুম্বন এঁকে দিলেন, “তোর যে সত্যিই এতো গুণ আমি জানতুম না।”

দুষ্টুমির হাসি হেসে পদ্মপ্রিয়া মা আর কাকিমাকে বলল, “এবার তোমরা খড়িমাটির আল্পনা দেওয়া ছাড়ো। আমি ফুলের পাপড়ি আর গুঁড়ো রঙ দিয়ে রঙ্গোলি করে দিচ্ছি।”

তারপর পুজোটুজো মিটে গেল খুব ভালভাবে। পদ্মপ্রিয়া একফাঁকে গিয়ে সেই বাক্সের নাড়ু বিলিয়ে দিল বস্তির কুসমি, পল্টু, জিষ্ণু, হিয়াদের মধ্যে। ছোড়দা গেল ব্যানার্জীবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আর সুরভীর সাথে দেখা করতে।            

ও ছাদে উঠে দেখল খুব বড় কোজাগরী চাঁদ উঠেছে, ঠিক ঝকঝকে রুপোর থালার মতো লাগছে চাঁদটাকে। হঠাৎ কোত্থেকে একটা সাদা লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে এসে ছাদে বসল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে উষ্ণীষের ফোন, “তোর জন্য একবাক্স  নারকেল নাড়ু আর নারকেল সন্দেশ রেখে দিয়েছি, কাল আসছিস তো?”

©জয়ী  

শুভ মহাষ্টমী

সর্বার্থসাধিকে,

জীবন যদি দুর্গোৎসব হয় তবে তুমি আমার অষ্টমী।
আমার প্রেম হোক অষ্টমীর অঞ্জলি,
আমার আকুলতা হোক পুষ্প,
আমার আবেগ হোক প্রসাদ,
মঙ্গলারতি আমার অনুরাগ,
একশ আট প্রদীপ হোক আমার আনন্দ,
আমার শৌর্য হোক পূজাউপাচার
আমার নৃত্যকলা হোক তোমার বিনোদন
আমার উচ্ছাস হোক তোমার ভোগ
আমার ত্রিশূল হোক তোমার ভরসা
আমার প্রগল্ভতা হোক তোমার পুষ্পমালা
আমার আনন্দ হোক তোমার আভরণ;
তুমি একবার তোমার দুর্গোৎসবে আমায় সামিল কর, বুঝিয়ে দের কতদূর সমর্পিত হতে পারি।
ইতি,
তোমার মহেশ্বর

©জয়ী

চিরন্তন নই

হে প্রিয়,

শুধু এটুকু মনে রেখো যে আমরা চিরন্তন নই,

চাঁদ-সূর্য চিরন্তন, ঝড়-বৃষ্টি চিরন্তন,

পর্বতের মাথায় লালরঙা সূর্যোদয়, নদীর বুকে পাথর, পাখির পরিত্যক্ত বাসা চিরন্তন,

চিরন্তন এমনকি আমাদের দুঃখের জীবনযাপনটুকুও,

তবু আমরা চিরন্তন নই, হব না কোনওদিন…

আমাদের গল্পটা রোজনামচা হওয়ার আগে, অভ্যাস হয়ে ওঠার আগে,
প্রাত্যহিক হয়ে ওঠার আগেই ভেঙে দেব সব,

ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমাদের যৌবনযাপন, প্রিয় আসবাব,

ফেলে দেব রঙিন পালক, পুঁতির হার, বইয়ের ভাঁজে শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপ,

কোনও খবর রাখব না তোমার প্রিয় বাঁশির, দেয়ালে ঝোলানো বাবুইয়ের বাসাটার,

যাওয়ার আগে ঝোলায় পুরে নেব আদরের “গীতবিতান”, মনভোলানো “সঞ্চয়িতা”

তোমার জন্য রেখে যাব “কালের মন্দিরা”, শঙ্খিনীর উপাখ্যান,

রেখে যাব গোধূলির শেষ আলোটুকু,

রেখে যাব মেঘলাদিনের শেষ বৃষ্টিটুকু!!

তাই তোমার আমার আর রূপকথা হওয়া হবে না,

আমি মুহূর্ততেই বেঁচে নেব সবটুকু বাঁচা,

মনে রাখব বসন্ত উৎসব, হলুদ-গোলাপি আবিরের লোকনৃত্য

মনে রাখব অষ্টমীর সকালের নরম রোদ, একসাথে অঞ্জলি,

মনে রাখব রবীন্দ্রজয়ন্তীতে করা প্রেম,

হিন্দোলযাত্রায় একসাথে চলা,   

মনখারাপি আষাঢ়ে বর্ষামঙ্গল শোনা…

তাই আমাদের গল্পটা ডাল-আলুপোস্ত হওয়ার আগে,

মাছবাজার হওয়ার আগে, সংসার হয়ে ওঠার আগে

ভুলে যাব এই প্রেমযাপন, এই বৃষ্টিভেজা, এই গঙ্গার হাওয়া!!

তোমায় মনে করব কালবৈশাখীতে

মনে করব শেষবিকেলের কমলা আলোয়, কোনএক নবমীর সকালে,    

মনে রাখব গ্রিক ট্র্যাজেডিতে,

মনে রাখব নর্ডিক রূপকথায়,

মনে রাখব গিটারের স্বরে,

তবু আমাদের গল্পটাকে কিছুতেই প্রাত্যহিক হতে দেব না!!

 

©জয়ী 

আজ “ক” নিয়ে কাব্যি হোক

কুন্দনন্দিনী কাঞ্জীভরম আর কানবালায় সুসজ্জিত হয়ে চলল কাঞ্চিপুরমের কমলাক্ষ্মী মন্দিরে পুজো দিতে। কিঞ্জল কান্তিবিদ্যা চর্চা করছে সেই কান্তারমরুর দেশে। আর কল্কিনারায়ণের বাড়িতে তখন কলাবৌ স্নানের তোড়জোড়। কনিষ্ক বসে বসে কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড পড়ছে। কৌশল্যা কোষাকুষি নিয়ে ব্যস্ত। কমল কলাপাতা কাটতে গেছে। কমলিনী আর কুন্দন কষ্টিপাথরের খোঁজ করছে। কোকিলকন্ঠী কৌশিকী কোকনদ ফোটানোয় ব্যস্ত। কাকাতুয়া ‘কোজাগরী’ ঘাড় বেঁকিয়ে সবকিছু পরখ করছে। কৈলাশেশ্বরীর পূজা চলছে কিন্তু কেউ এতটুকুও কুশল বিনিময় করছে না। সকলেই কালের কণাদে মনোনিবেশ করেছে।

অন্যদিকে কৌশানী কংসের কারাগার, কেদারনাথধাম, কনখল ঘুরে এখন কাশীতে এসেছে। কাশীশ্বরকে পুজো দিয়ে ও কচৌরি গলিতে ঢুকল কচুরি খেতে। কমলাভোগ ওর খুব প্রিয়। কেশরীজির কুঠী হল ওর কাশীর আস্তানা। কাশীতে ওর পরিচয় হয়েছে কিয়েভবাসী কেভিনের সঙ্গে; কেভিন কাঠিয়াবাবার শিষ্য।

কৃষ্ণরাজ এখন কলকাতা ছেড়ে অনেকদূরে, সুদূর কাবুলে। কষা মাংস আর কবিরাজী খায়নি অনেকদিন হল। কিয়ারার সান্নিধ্যেও কঙ্কাবতীকে এতটুকু ভোলেনি ও। কঙ্কাবতী এদিকে কার্ডিফে বসে কাস্টার্ড খাচ্ছে। কৃশান্যা, কৌমুদী, কর্ণিকরা কস্মিনকালেও কল্কিবাড়িতে পুজো দেখতে আসেনি; কেশব কাজিরাঙা বেড়াতে গেছে; কানাইলাল কাজু, কিসমিস, কেসর সহযোগে কাশ্মীরী পোলাও রাঁধতে ব্যস্ত । এরা সকলেই কল্কিবাড়ির সদস্য ! সৌভাগ্য/দুর্ভাগ্যবশত একমাত্র সেটিই এখন যোগাযোগের সুতো।

The Ganapati Diaries

To the girl I met during Ganapati utsav,

It was my first time in Mumbai. I was still trying to connect the lines of the sleepless city. And adventitiously, Ganapati festival hit Mumbai to overwhelm me. I timidly showed up at the society’s Ganapati feast. In such an evening of drizzling rains and the boisterous Ganapati festival, your eyes met mine! You were wearing a green-pink paithani silk in Marathi style. And you were looking fabulous. Your Marathi nathani (nose pin) made your face even sweeter; the small crescent moon bindi on forehead snatched all my concentrations. You smiled at me and one thousand chandeliers lit up. A smile simply crept into my lips.
You said, “Take a modak, it’s delicious” holding a big bowl of modaks before me. I don’t like sweets but I took one just to make you happy.
“Thanks” I uttered.
“New here?” You asked spreading the luminous smile.
“Yes. From Kolkata”. I replied.
“Happy Ganesh Chathurthi” You greeted me.
Your happy face made me happy inside.
“Same to you” said I. I wish I could show you how fast my heart was beating at that moment. I waned to talk to you. I wanted to say “You look beautiful”. But my lips lost words. You got busy distributing sweets among others. I realized, suddenly all my sadness, boredom and homesickness are gone and I am loving this evening. I am loving the Ganapati festival. I am loving life once again. I am not lost anymore. I looked at lord ganesha. He is staring at us with omnipresent eyes. I asked for blessings.
My eyes searched for you once more. My eyes wanted to get a glance of your face but you were nowhere. Finally, I discovered you at the feet of Ganapati Bappa. You were sobbing. And a girl was trying to console. I hesitantly walked towards you. The crowd was light by the time; the rain had stopped.
“What happened?” I asked. She looked up hearing my voice. The teary eyes were too sad to look at. She continued to sob while the other girl replied.
“Her lover Amrut died last year during immersion of Ganapati. Today the incident completes one year.” I was shocked. I don’t know what to say. She was hiding so much pain under those greeting smiles. Slowly, I held her hand, “Girl, I will give my shoulder whenever you want to cry.” I don’t know what magic my words did but she tried to erase the tears and looked at me.
“You don’t even know me.”
“I will” said I. Once again her “nathani” winked at me as she tried to smile amid those tears. No one noticed a nerd Bengali boy won the heart of a Marathi girl.

Sincerely yours,
That Bengali boy

©Joyee

 

চোখের তারায় আয়না ধরো

আমার কৈশোরে এমি ওয়াইনহাউসেকে দেখেই প্রথম জেনেছিলাম winged eyeliner বা ডানাওয়ালা আইলাইনার আসলে কি বস্তু; অবশ্য সত্তর আশির দশকের নায়িকারাও এভাবেই তাদের আঁখিপাতাকে সাজাত। আমি যে সময়টায় পনেরো-ষোলো তখন সবাই ওই আইলাইনারই লাগত, কখনও বা ইচ্ছে হলে একটু মাস্কারা, এর বেশি কিছু পরার চল ছিলনা, অন্তত টিনএজের মেয়েদের মধ্যে। এখন যখন দেখি সব বাচ্চা মেয়েরা কি নিরুপদ্রবে আইভ্রু পর্যন্ত এঁকে নিচ্ছে আইভ্রু লাইনার দিয়ে , তখন হিংসে তো হয়ই।

আমি তখন সবে মাত্র ষোলো। আইলাইনার, কাজল, মাস্কারা কিছুই ব্যবহার করি না, শুধু কোনো নিমন্ত্রণ থাকলে একটু আইলাইনার লাগাতাম। এসবের মধ্যেই হঠাৎ গোল বাঁধল একটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারকে কেন্দ্র করে; আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়া আমাকে একটি ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার উপহার দিলেন…তখন পর্যন্ত ওই বস্তুটি কি, খায় না মাথায় দেয় আমিতো তাও জানতাম না; কিন্তু উনি ব্যবহার করা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। যেভাবে আমরা সাদা কাগজে স্ট্যাম্প মারি কালি দিয়ে , ঠিক তেমনি! এখানে স্ট্যাম্প হল ওই সরু আইলাইনারের মুখে লাগান একটা ছোট্ট তারা, আর বোতাম টিপলে ভিতর থেকে কালি আসবে…ব্যাস, এবার চোখের কোণে, গালে, থুতনিতে যেখানে ইচ্ছে ষ্টার স্ট্যাম্প মেরে নিলেই হল। অনেকে কাজল পেন্সিল দিয়ে চোখের পশে উল্কি আঁকে, আর এ হল রেডিমেড উল্কি, অনেক বেশি সূক্ষ্য, নিখুঁত আর শুধু একটি স্ট্যাম্প দিলেই কেল্লাফতে! কি সুন্দর চোখের পলকে ষ্টার ছাপ পড়ে যেত, দেখেই ভাল লাগত।

আমি ঠিক করলাম এটা পরে বন্ধুদের চমকে দিতে হবে, কিন্তু স্কুলে তো আর ওসব পরে যাওয়া সম্ভব নয়! স্কুলে তখন প্রায়ই নখ চেক হত, আর সেখানে আইলাইনার পরে গেলে তো আর রক্ষে নেই। তো আমি বন্ধুদের চমকে দেওয়ার জন্য দুর্গাপুজোর সপ্তমী বাছলাম। ঠিক হল ঐদিন বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখব। কাউকে ঘুণাক্ষরেও আমার এই আইলাইনারের কথা বললাম না, স্কুলে যথারীতি পুজোর ছুটি পড়ে গেল আর আমি অপেক্ষায় থাকলাম কবে ওই ডানাওয়ালা আইলাইনার আঁকব, ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে নিজেকে সাজাব আর আমার বন্ধুরা আমাকে দেখে চমকে যাবে। মেয়েরা কি আর শুধু ছেলেদের জন্য সাজে, মেয়েরা তো সাজে অন্য মেয়েদের দেখাবে বলে !  

যাই হোক,সপ্তমীর দিন খুব ভাল করে সাজলাম, অঙ্গে পিওর সিল্ক, কানে ঝুমকো, আঁখিপল্লবে আইলাইনার আর অতি অবশ্যই ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার অর্থাৎ চোখের পাশে ছোট্ট ছোট্ট তারা। আমি গিয়ে পৌঁছলাম সবার আগে, মণ্ডপে বসে আছি, দেখি মৌমিতা আসছে । ও জামদানি পরেছে আর খোঁপায় গোলাপ; হঠাৎ দেখি ওর চোখের কোণে কি যেন….একি!!! ওর চোখের কোণে দেখি ছোট্ট বাঁকা চাঁদ…ক্রিসেন্ট মুন স্টাইলে অর্ধচন্দ্র আঁকা ওর থুতনিতেও।

আমাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ও বললো, “দেখ দেখ, এ হল এখনকার নতুন স্টাইল স্টেটমেন্ট; মুন-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে এঁকেছি এগুলো !!”

আমি যেন থতমত ভাবটা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, আচ্ছা আমার তো সবাইকে চমকে দেওয়ার কথা ছিল, আমি কেন চমকে যাচ্ছি ! হালকা হেসে বলি, “তুই মনে হয় আমার দিকে ভাল করে তাকাসনি এখনও”।

আমার কথা শুনে ও তাকায় আমার দিকে, এবার বেশ অনেকক্ষণ ধরে…আমি মুচকি হাসি।

“স্ট্যাম্প আইলাইনার বুঝি তুই একাই কিনতে পারিস, এই দেখ আমার ব্র্যান্ড নিউ ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনার…এবার কি বলবি?”

“কিন্তু….”

মিষ্টি হেসে ওকে বলি, “তোর কাছে যা থাকতে পারে, তা তো অন্য কারো কাছেও থাকতে পারে, তাই না? অত ভেঙে পড়ার কিছু হয়নি।”

“দেখ দেখি বাকিদের তো এখনো পাত্তা নেই।” বলে ওঠে মৌমিতা। বুঝি প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইছে ও; আমি মনে মনে হাসি…আমি ওর থেকেও বেশি ঘেঁটে গেছি কিন্তু বাইরে স্বাভাবিক থাকি নয়তো আইলাইনার ঘেঁটে যাবে যে !    

ধীরে ধীরে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে সৌমি, ঐশী, স্মিতাক্ষীরা।

“এতক্ষনে তোদের আসার সময় হল?”

“কি করব…সাজতে সাজতে দেরি হয়ে গেল।” খুব ঘাড় বেঁকিয়ে বলল ঐশী।

দেখি ঐশীও খুব মাঞ্জা দিয়ে সেজেছে, একটা সাদা শার্ট আর রঙিন জয়পুরি ধাঁচের ঘাগরা, তাতে আবার কাঁচের কাজ!

পাশ থেকে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, “ঐশীকে দেখ, গলায় কিসব গুজরাটি ট্যাটু, থুতনিতে সূর্য।”

“ওরে মৌমিতা ফিসফিসিয়ে কি বলছিস…দেখ দেখ, এসব সব স্ট্যাম্প আইলাইনারের কামাল! আমার থুতনিতে যে ছোট্ট সূর্যটা দেখছিস ওটা সান-স্ট্যাম্প আইলাইনার দিয়ে করেছি…আর গলায় যে একসারি ছোট ছোট ষ্টার দেখছিস ওটা ষ্টার-স্ট্যাম্প আইলাইনারের কাজ; একটা করে জাস্ট স্ট্যাম্প মেরেছি; আগে দেখেছিস কখনও?” ঐশী এমন ফর্মে কথাগুল ছুঁড়লো যেন ও মেরিলিন মনরো আর আমরা আতিপাতি। আমার খুব রাগ হল। ভাবছি ওকে গাড্ডায় ফেলি কি করে, দেখি আমার আগে সৌমিই সেই কাজটা করে দিল।
“আচ্ছা ঐশী, আমি তো দেখছি তুই একা নয়, জেনি আর মৌমিও তো স্ট্যাম্প আইলাইনার পরেছে!” সৌমি বলে ওঠে। আমরা দু’জন আত্মবিশ্বাসে ভোর করে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, “দেখো হিরোইন, আমরাও স্ট্যাম্প আইলাইনার লাগিয়েছি…কোনো বক্তব্য আছে?”

এবার কেঁদে ফেলার জোগাড় ঐশীর ! ওর কান্ড দেখে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠি।
“আরে কাঁদিস না, কাঁদিস না, আইলাইনার সব ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে যে…” অনেক কষ্টে যখন আমরা ওকে শান্ত করলাম, তখন আর ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় হাতে নেই; বৃষ্টি এসে গেছে প্রচন্ড জোরে ! অগত্যা, মণ্ডপেই গল্প জুড়লাম আমরা !!

আজ যখন ষ্টার-সান-মুন-হার্ট-বো-কিউপিড-অ্যারো আরও কতধরনের স্ট্যাম্প দেখি, সেসব দিনের কথা খুব মনে পড়ে।সেদিনের কথা আজ মনে পড়লে আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠি। সত্যি এই জন্যই বোধহয় লোকে বলে, “বাপেরও বাপ্ আছে”।।

©জয়ী