লক্ষ্মীমন্তঃ

লক্ষ্মীমন্তঃ—

খয়েরি চুলের টুকটুকে ফর্সা পদ্মপ্রিয়া। বয়স সতেরো পেরিয়ে আটেরোতে পড়েছে। ছোটখাটো চেহারা। সারা বাড়িময় উড়ে বেড়ায় প্রজাপতির মত। যদিও সে একেবারেই লক্ষ্মীছাড়া, কোনো ঘরের কাজ ঠিকমত পারেনা, পারে শুধু খেতে, ঘুমতে, তীব্রবেগে বাহন ছোটাতে, ই-বুক পড়তে আর একটুকরো কাগজ পেলেই তাতে আঁকতে। ওর আঁকার হাত খুব ভাল। তবু দুরন্তপনার জন্য ঠাকুরমা কোনোদিন ওকে আলপনা আঁকতে দেয় না। পদ্মপ্রিয়া মনে মনে হাসে। কাল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ও বেশ কয়েকটা লক্ষ্মীর পট এঁকেছে। সেগুলো যথাসময়ে পৌঁছেও গেছে ওর বন্ধুদের বাড়ি। ও সকাল সকাল উঠে পুজোর জোগাড় করলে বসল একটা লাল কুর্তি পরে আর ঠাকুমা গজগজ করতে লাগলেন, “আঠেরো বছর হয়ে গেল, এখনো শাড়ি পড়তে শিখল না। উনি চুল রঙ করে, গলায় ফাঁস দেওয়ার মতো হার পরে, একপায়ে নুপুর পরে সাজের বাহার করছেন। এই মেয়ে কোনোদিন লক্ষ্মীমন্ত হবে না।”

পদ্মপ্রিয়া ভাবল ঠাকুমা বকবক করতে থাকুক, মা যখন নাড়ুগুলো বানিয়েই ফেলেছে, আমি যাই একবাক্স আলাদা করে রেখে দেই। যেমন ভাবা তেমনি কাজ; ও উঠে গেল প্রসাদ সাজানোর ছুতোয়। তারপর কিছুক্ষন আর ও ঠাকুমার কাছে আসেনি।        

লক্ষ্মীঠাকুর আনতে যাওয়ার কথা উঠতেই ঠাকুমা বেঁকে বসল, “থাক বাছা, তুমি যা লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে, তুমি আর লক্ষ্মীঠাকুর আনার কাজটা নাই বা করলে। ওসব আমার নাতিরা ঠিক সামলে নেবে। পদ্মপ্রিয়ার দুই দাদা তখন ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পদ্মপ্রিয়ার মনে হল এই হাসি অর্থপূর্ণ, যদিও মুখে কিছু বলল না।
পুজোর সময় পদ্মপ্রিয়া সেজেগুজে এসে দেখে তার আঁকা একটা পট বসানো হয়েছে, যেখানে লক্ষ্মীঠাকুর বসানোর কথা ছিল, ঠিক সেখানে। তবে কি এবার পটে আঁকা লক্ষ্মী পুজো হবে? এরকম তো আগে কখনো হয়নি !

“এস ম্যাডাম, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।” বলে ওঠে ছোড়দা।

“সারপ্রাইজ? কি জন্য? দাদা তোরা ঠাকুর আনতে যাসনি? এখানে তো পট…” পদ্মপ্রিয়ার দু’চোখে তখন বিস্ময়।

তুই চলে গেলি সাজুগুজু করতে আর ঠাকুমা কাঁসার বাসন নামাতে গিয়ে আবিষ্কার করল তোর পটে আঁকা লক্ষ্মী। দেখে ঠাকুমার এতো ভাল লাগল যে ঠিক হল এবার ওই পটের মা’লক্ষ্মীকেই পুজো করব আমরা।
“কিন্তু তাহলে বাড়ির ঐতিহ্যের কি হবে? কতকাল ধরে তো…”

ওকে থামিয়ে দিয়ে ঠাকুমা বলল, “সে তোকে ভাবতে হবে না। আমার লক্ষ্মীমন্ত নাতনির জন্য সেসব মঞ্জুর”।   

আনন্দে চোখে জল এল পদ্মপ্রিয়ার, ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ঠাকুমাকে। ঠাকুমা নাতনির মাথায় স্নেহচুম্বন এঁকে দিলেন, “তোর যে সত্যিই এতো গুণ আমি জানতুম না।”

দুষ্টুমির হাসি হেসে পদ্মপ্রিয়া মা আর কাকিমাকে বলল, “এবার তোমরা খড়িমাটির আল্পনা দেওয়া ছাড়ো। আমি ফুলের পাপড়ি আর গুঁড়ো রঙ দিয়ে রঙ্গোলি করে দিচ্ছি।”

তারপর পুজোটুজো মিটে গেল খুব ভালভাবে। পদ্মপ্রিয়া একফাঁকে গিয়ে সেই বাক্সের নাড়ু বিলিয়ে দিল বস্তির কুসমি, পল্টু, জিষ্ণু, হিয়াদের মধ্যে। ছোড়দা গেল ব্যানার্জীবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আর সুরভীর সাথে দেখা করতে।            

ও ছাদে উঠে দেখল খুব বড় কোজাগরী চাঁদ উঠেছে, ঠিক ঝকঝকে রুপোর থালার মতো লাগছে চাঁদটাকে। হঠাৎ কোত্থেকে একটা সাদা লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে এসে ছাদে বসল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে উষ্ণীষের ফোন, “তোর জন্য একবাক্স  নারকেল নাড়ু আর নারকেল সন্দেশ রেখে দিয়েছি, কাল আসছিস তো?”

©জয়ী  

Published by

joyeesorceress

Thinker, writer, poetess, dreamer, worshiper of creativity, film enthusiastic

2 thoughts on “লক্ষ্মীমন্তঃ”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s