Diary of a jerk

Diary of a jerk:

The crazy winds grazed my face adorably, the first ray of the morning sun invaded my eyes and some morning birds kept chirping. On such a cloudy morning I discovered myself in bed with my ex. I opened my doped eyes and felt like I was just dropped from the sky! It is a very natural feeling when you wake up after long. And I slept like eternity! Slowly the memories of yesterday evening along with the steamy night came before my eyes and I sighed. I searched for the packet of cigarette and her solemn face caught my eyes. Once again her sweet face made me forget what I was searching or what I was thinking.
I looked at the walls; the tiny bulbs are still twinkling. The windowpane is also glittering, bedecked with tiny raindrops. The posters laughed at me. And I looked at her sleeping face. I gazed as if she is the sleeping princess and I am the prince charming to wake her up! Her lunar tattoo on neck greeted me a good morning. Slowly, my eyes rolled into the room, the floor…the paper rolls are still scattered, the empty bottles are lazing away the time. They too probably are quite surprised seeing us together.
I remembered how I met her last night, how she was crying, how I took her home…my home! I remembered how we powdered our noses and drank hard liquor as if there is no tomorrow. And then, like two highly reacting chemicals, we mixed up in bed. Thunders were deafening, lightning was loud and it rained torrentially. We both bafflingly tried to invade and console each other. I wonder how I am still alive after taking so many drugs together!

©Joyee

একটি শীতবস্ত্রের উপাখ্যান

একটি শীতবস্ত্রের উপাখ্যান

©জয়ী সামসুল

কলকাতার বাতাসে তখন সুইট নভেম্বরের বিষাদ সুর। আমার মন জুড়ে কোল্ডক্রিম, কড়াইশুঁটির কচুরি আর নলেন গুড়ের সুঘ্রাণ। এমনই এক নভেম্বরি বিকেলে, ঢিমে আঁচের রোদকে সঙ্গী করে আমি গেলাম সোয়েটার কিনতে। টার্টলনেক সোয়েটার, স্কার্ফওলা সোয়েটার, কুইল্টেড কোট, হরেকরকম জ্যাকেট দেখার পর যখন আমার চোখে পড়ল হলদেটে বাদামিরঙের একটা ওভারসাইজড wrapকোট, তাতে আবার ভেলভেটের নক্সা করা। কলারটাও খুব সুন্দর ভিকটোরিয়ান ধাঁচের। দাম দেখে ছিকটে এলাম বটে কিন্তু ওই wrapকোটের আভিজাত্য দেখে ঠিক করে ফেললাম এটা কিনতে হবে। তখন কলেজের দ্বিতীয়বর্ষ, হাতে পয়সাকড়িও বেশী নেই। আমার প্রেমিকপ্রবর পাবলো তখন প্রায়ই সাদা একটা হুডি পরে কলেজে আসত। সেটার সামনে আবার বড় বড় করে লেখা ছিল, “ডু নট রিড দ্য নেক্সট লাইন”; তারপর খুব ছোটছোট করে লেখা “ইউ আর আ রেবেল, আই লাইক ইউ।” ওটা দেখে আমারও খুব সাদা হুডি কেনার ইচ্ছে হতো। কিন্তু এই বাদামি কোটটা দেখার পর থেকে সাদা হুডি কিংবা সোয়েটার কেনার ইচ্ছে উবে গিয়ে ওটা পাবার ইচ্ছেই মূর্ত হয়ে উঠল। পাবলোকে সেই কথা বলতে ও মাথা চুলকে বলল, “উপায় একটা আছে। তুমি কি রাজি হবে?” আমি কোনোরকম চিন্তা না করেই বললাম, “বল বল…রাজি হব না কেন?”

পাবলো বলল, “আমরা দু’জনে মিলে ওই কোট কিনে ফেলতেই পারি।” ওর ফান্ডা আমারও খুব ভাল লাগল।  সেইমতো আমরা আমাদের দু’জনের টাকা মিলিয়ে কিনে ফেললাম সেই লম্বা, দীর্ঘায়িত কলারওয়ালা বাদামি কোট। ঠিক হল দু’জনেই ওটা পরব সময় সুযোগমতো। আমি কোথাও বেড়াতে গেলে বা নেমন্তন্নবাড়ি গেলে পরব, ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে কোথাও গেলে কিংবা রেস্তোঁরাতে খেতে গেলে পরবে। কেনার পর ও বলল, “আপাতত তুমি এটাকে বাড়ি নিয়ে যাও, দরকার হলে আমি চেয়ে নেব।” সেদিন আমার আনন্দ দেখে কে। বাড়ি ফিরে খুব যত্ন করে আমার সদ্য কেনা wrapকোট তুলে রাখলাম। বাড়িতে দামের ব্যাপারটা চেপে গেলাম। এরপর একদিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছি ওই কোট পরে। ওই আত্মীয়া প্রথমে অত খেয়াল করেননি, কিন্তু আমাকে ছোট্ট একটা প্লেটে পেস্ট্রি এগিয়ে দিতে গিয়ে ওঁর নজরে পড়ল আমার বাদামি ভিকটোরিয়ান কোট। উনি আরেকটু হলেই প্লেটটি আমার গায়ে ফেলে দিতেন। শেষে নিজেকে সামলে নিয়ে গল্প করতে লাগলেন। ওনার মেয়ের গল্প, ইউরোপে কতটা ঠান্ডা পড়ল, তাতে কলকাতার কি এসে গেল এই জাতীয় সব আগডুম বাগডুম গল্প শুনতে বিরক্ত লাগলেও শুনতে হল। মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি মা’ও ওনার গল্প শুনে হাসছে। যাই হোক আমি বুঝলাম যে এই কোট পরলে সবাই আমাকে নিয়ে একটু উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছে। আসলে এই কোট পরলে যে কোন ব্যক্তিকেই হেলাফেলা ভাবা মুশকিল। কোট বাবাজী’র কান্ড দেখে আমার ভীষণ গর্ব হল। এদিকে শ্রীমানকে এই কথা বলতে সে তো হেসে লুটোপুটি।

আমাদের মধ্যে একটা অলিখিত চুক্তি ছিল যে আমরা দু’জন যখন একসাথে বেরোব তখন আমরা রোটেশন করে কোট পরব, মানে একদিন আমি পরলে পরদিন ও। যে দিনগুলোতে ও কোট পরবে সেদিনগুলোতে পরার জন্য আমি এসপ্ল্যানেড থেকে একটা সস্তার পিচরঙা পুলওভার কিনেছিলাম। একদিন আমরা একটা কফিশপে গেছি, হঠাৎই পাবলো অসাবধানতাবসত টেবিলে কফি উল্টে ফেলল আর সেই কফি ছলকে গিয়ে কোটে লাগল। আমার খুব রাগ হল, ওকে বকাবকি করলাম, রুমাল দিয়ে তখনকার মতো কফি মুছে দিলাম কিন্তু একটু দাগ সেই থেকেই গেল। তখন ভেবেছিলাম বাদামি কোট, বাদামি কফি অত বোঝা যাবে না। কিন্তু পরে দেখলাম একটু হলেও দাগটা বোঝা যাচ্ছে।
এই ঘটনার দিন দশেক পর আমি একটা অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানে আদরের কোটটা পরে গেলাম। এবং খেতে গিয়ে খুব সুন্দরভাবে আমার রাজকীয় বাদামি কোটে মোমোর সুপ্ ঢেলে ফেললাম। সুপ্ যদিও ট্যালট্যালে হয়, কিন্তু আমি আবার সুপের মধ্যে সস মিশিয়ে নিয়েছিলাম। ফলত, শখের কোটের যে কি অবস্থা হল তা বলাই বাহুল্য। আমার রীতিমতো কান্না পাচ্ছিল; তবু কোনোরকমে কান্না চেপে বাড়ি ফিরে গেলাম। সেদিন রাতেই ওই সসের দাগ তা ডিটারজেন্ট দিয়ে ওঠালাম। ঠিক করলাম একবার ড্রাইওয়াশ করিয়ে নেব। সেদিন ও কফি ঢেলে ফেলায় অত রাগ করেছিলাম বলেই বোধহয় আমার নিজের হাত দিয়ে সুপ্ উল্টে গেল।
এই কথা ওকে বলতেই পাবলো প্রথমে ছদ্ম রাগ দেখাল, তারপর হো হো করে হাসতে লাগল; দুষ্টুমির হাসি হেসে বলল, “দেখ, দেখ…আমায় বলছিলে না আমি বাচ্চাদের মতো কফি উল্টে ফেলেছি…”। আমি আর কি করব…নিজের ওপর রাগটা সম্বরণ করে হাসিতে যোগ দিলাম। ড্রাইওয়াশ করতে ভালই খসেছিল, কোটটিও আগের অবস্থায় ফিরে এসেছিল। এরপর একদিন কলেজে ফেস্ট আর সাথে আমাদের ইয়াব্বড় অ্যাসাইনমেন্ট। আমি বাড়িতে বসে অ্যাসাইনমেন্ট লিখছি আর পাবলো ফেস্ট এ গেছে। আমি লিখে লিখেও কিছুতে শেষ করতে পারছিনা আর তিনি ওখানে নাচানাচি করছেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভাল কোট তখন ওনার জিম্মায়। ঠিক আছে, সেই নিয়েও আমার মাথাব্যথা নেই; কোট তো দু’জনেরই। পরদিন সকালে যখন কলেজে গেছি দেখি সবাই অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে মরিয়া। পাবলো সেদিনও অনেক দেরি করে কলেজে এল। ও এসে বলল ঘুম থেকে উঠতে নাকি দেরি হয়ে গেছিল। যদিও আমি দেরিতে আসার আসল কারণ জানতাম। আগের দিন অত নাচানাচি করলে কলেজে আসতে দেরিতো হবেই। যাই হোক ওকে আমার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিলাম আর ও সেটা দেখে টুকেও নিল। সেদিন বিকেলে কোট ফেরত দিল ও। আমি তো কোট নিয়ে বাড়ি চলে গেছি; তুলে রাখতে গিয়েও ভাবলাম একবার পকেটগুলো দেখি তো, যেন ভারী ভারী লাগছে।
হাত দিয়ে দেখি বাঁদিকের পকেটে একটা কিংসাইজের চকলেট বার। বুঝলাম ওই নাচানাচির জন্য আমাকে ঘুষ দেওয়া হয়েছে যাতে বেশী রাগারাগি না করি। আমি উপহার দেওয়ার ধরণ দেখে খুশি হলাম; আমি এমনিতেই চকোলেটের পোকা, তার ওপর সেটা বেরিয়েছে প্রিয় কোটের পকেট থেকে। ঠিক যেমন মোজার মধ্যে থেকে উপহার পেলে বড়োদিনে বাচ্চারা খুশি হয়। ঠিক করলাম আমিও কিছু রেখে দেব ওই কোটের পকেটের ভেতরে। আমি ওকে এককৌটো সল্টেড কাজুবাদাম দিয়েছিলাম। এভাবেই আমরা শীতকাল জুড়ে ওই কোটের পকেটে করে চিঠি, ফুল, কুকিজ, চকোলেট, বাদাম, ছোট্ট টেডি, প্রচ্ছন্ন হুমকি…না জানি আরও কত কি চালাচালি করেছিলাম।

আমাদের জীবন যেমন এক সোয়েটার থেকে অন্য সোয়েটারে বয়ে যায়, সম্পর্কও তাই। কোটেরও ভেলভেট মলিন হল, কলারে ধুলো জমল, একটা বোতাম খসে পড়ল। বোতাম যদিও সেলাই করে নিয়েছিলাম, পাবলোর সাথে সম্পর্কটাকে সেলাই করতে পারিনি। আমি তো আর বাবুই পাখি নই। তাই আমার সাধের কোট যেদিন দর্শিনীকে পরতে দেখলাম, মনে হচ্ছিল কোটটা নিয়ে ছুঁড়ে রাস্তায় ফেলে দিই; গাড়ি চলে যাক ওটার ওপর দিয়ে, পৃষ্ঠ হোক পদাঘাতে। প্রসঙ্গত, তখন আমাদের সংঘাত চরমে। কথা কাটাকাটি চলছে খুব, মুখ দেখাদেখি বন্ধ। আসলে আমাদের মধ্যে যত ঝগড়া, তত গলায় গলায় ভাব। ওরকম প্রায়ই হত; তাই আমিও অত মাথায় ঘামাইনি। সেদিন ঝগড়াটা শুরু হয়েছিল সামান্য খুনসুটি দিয়ে।

পাবলোকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাদের কোট দর্শিনী পরেছিল কেন?” ও দেখলাম স্বাভাবিক গলায় বলল, “গতকাল আমরা লাইব্রেরিতে বসে নোটস বানাচ্ছিলাম। ফেরার সময় দর্শিনী বলল ও সোয়েটার আনতে ভুলে গেছে। রাতের দিকে শীতটাও  একটু বেড়েছিল, তাই ওকে পরতে দিয়েছিলাম।” পাবলোর কথা শুনে আমার ভারী রাগ হল। আমাদের সোয়েটার দর্শিনীকে পরতে দিয়েছে, আবার কোনো অনুশোচনাও নেই। বললাম, “ওটা তুই রেখে দে, আমার আর চাইনা। যখন ইচ্ছে, যাকে খুশি পরতে দিবি।”
“আরে রাগ করছ কেন? সেদিন আমার তো একটা জ্যাকেট ছিল; ও বেচারি হালকা কটনের শার্ট পরেছিল…”
“ভাবছি তোমার একটা নতুন নাম দেব…’উপকারের দেবতা’।” আমি মুখে এটা বললাম বটে কিন্তু মনে মনে খুব রাগ হল দর্শিনীর ওপর। আমার বিশ্বাস ও উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে কোটটা নিয়েছিল। এরপর থেকে আমি সেই কোট আর কোনোদিন পরিনি। পরতে ইচ্ছে হয়নি। কোটটাও পুরোনো হয়ে এসেছিল। পাবলোর কাছেই ওটা বেশিরভাগ সময় থাকত।
কিছুদিন পর আমি সপরিবারে কার্সিয়াঙে বেড়াতে গেলাম। বন্ধুত্ব হল নিশা ছেত্রীর সঙ্গে। বছর সতেরোর মেয়েটি হোটেলের গাছগুলোর পরিচর্যা করতে আসত প্রতিদিন সকালে। তার পরনে বরাবর একটা জীর্ণ রংচটা খয়েরি সোয়েটার। নিশাকে বললাম, “আমার কাছে একটা উলের কোট আছে। তুই নিবি?” নিশাকে ঘরে নিয়ে এসে কোটটা দেখলাম। ও নিতে একটু ইতস্তত করছিল; কিন্তু আমি যখন কোট ওর গায়ে জড়িয়ে দিলাম, ওর মুখে সে কি অপার্থিব হাসি। সেই প্রথম কারো মুখে হাসি ফুটিয়ে মনে মনে গর্ববোধ করলাম। নিশা বলল, “দিদি, তোমার অন্য সোয়েটার আছে তো?” আমি বললাম, “হ্যাঁ রে, এই তো তোদের কার্সিয়াং থেকে কিনে নিয়েছি।” আসলে বাচ্চা মেয়েটা ঠান্ডায় কাঁপতো, সেটা আমার ভাল লাগত না। পাবলোকে ফোন করে একথা বলতেই ও খিলখিলিয়ে হেসে বলল, “উপকারের দেবী যখন দিয়েছে, আমার আর কি বলার থাকতে পারে।” বুঝলাম, ও কথাটা অভিমানের সুরে বলল। ওই কোট জুড়ে আমাদের দু’জনের কত স্মৃতি; তাই কোট কাউকে দান করে দেওয়াটা ওর ভাল লাগেনি। তাই ওর অভিমানে প্রলেপ দিতে বললাম, “আমরা খুব সুন্দর দেখে একটা কুইল্টেড জ্যাকেট কিনব এরপর।”
দুর্ভাগ্যবশত সেটা আর হয়ে ওঠেনি। একটা কোট কিংবা সোয়েটার ভাগাভাগি করে পরা তো দূরের কথা, একসাথে নন্দন যাওয়া বা কফিশপে বসাও হয়নি। ও চাকরিসূত্রে অন্যশহরে চলে গেল আমি কার্সিয়াং থেকে ফেরার আগেই, কিছুদিন পর আমিও কলকাতা ছাড়লাম ওই একই কারণে। প্রতিবার শীতকাল এলেই আমি ঠিক করি একটা সুন্দর দেখে সোয়েটার কিনব। আজকে ভাবি ওই কোটটা যদি নিশাকে না দিতাম, আমার কলেজপ্রেমের একটা স্মৃতি অন্তত থেকে যেত। পাবলোর অভিমানটা আজকে বুঝি, কিন্তু এখন যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

বিঃ দ্রঃ : গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক; কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।  

লক্ষ্মীমন্তঃ

লক্ষ্মীমন্তঃ—

খয়েরি চুলের টুকটুকে ফর্সা পদ্মপ্রিয়া। বয়স সতেরো পেরিয়ে আটেরোতে পড়েছে। ছোটখাটো চেহারা। সারা বাড়িময় উড়ে বেড়ায় প্রজাপতির মত। যদিও সে একেবারেই লক্ষ্মীছাড়া, কোনো ঘরের কাজ ঠিকমত পারেনা, পারে শুধু খেতে, ঘুমতে, তীব্রবেগে বাহন ছোটাতে, ই-বুক পড়তে আর একটুকরো কাগজ পেলেই তাতে আঁকতে। ওর আঁকার হাত খুব ভাল। তবু দুরন্তপনার জন্য ঠাকুরমা কোনোদিন ওকে আলপনা আঁকতে দেয় না। পদ্মপ্রিয়া মনে মনে হাসে। কাল কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। ও বেশ কয়েকটা লক্ষ্মীর পট এঁকেছে। সেগুলো যথাসময়ে পৌঁছেও গেছে ওর বন্ধুদের বাড়ি। ও সকাল সকাল উঠে পুজোর জোগাড় করলে বসল একটা লাল কুর্তি পরে আর ঠাকুমা গজগজ করতে লাগলেন, “আঠেরো বছর হয়ে গেল, এখনো শাড়ি পড়তে শিখল না। উনি চুল রঙ করে, গলায় ফাঁস দেওয়ার মতো হার পরে, একপায়ে নুপুর পরে সাজের বাহার করছেন। এই মেয়ে কোনোদিন লক্ষ্মীমন্ত হবে না।”

পদ্মপ্রিয়া ভাবল ঠাকুমা বকবক করতে থাকুক, মা যখন নাড়ুগুলো বানিয়েই ফেলেছে, আমি যাই একবাক্স আলাদা করে রেখে দেই। যেমন ভাবা তেমনি কাজ; ও উঠে গেল প্রসাদ সাজানোর ছুতোয়। তারপর কিছুক্ষন আর ও ঠাকুমার কাছে আসেনি।        

লক্ষ্মীঠাকুর আনতে যাওয়ার কথা উঠতেই ঠাকুমা বেঁকে বসল, “থাক বাছা, তুমি যা লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে, তুমি আর লক্ষ্মীঠাকুর আনার কাজটা নাই বা করলে। ওসব আমার নাতিরা ঠিক সামলে নেবে। পদ্মপ্রিয়ার দুই দাদা তখন ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। পদ্মপ্রিয়ার মনে হল এই হাসি অর্থপূর্ণ, যদিও মুখে কিছু বলল না।
পুজোর সময় পদ্মপ্রিয়া সেজেগুজে এসে দেখে তার আঁকা একটা পট বসানো হয়েছে, যেখানে লক্ষ্মীঠাকুর বসানোর কথা ছিল, ঠিক সেখানে। তবে কি এবার পটে আঁকা লক্ষ্মী পুজো হবে? এরকম তো আগে কখনো হয়নি !

“এস ম্যাডাম, তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে।” বলে ওঠে ছোড়দা।

“সারপ্রাইজ? কি জন্য? দাদা তোরা ঠাকুর আনতে যাসনি? এখানে তো পট…” পদ্মপ্রিয়ার দু’চোখে তখন বিস্ময়।

তুই চলে গেলি সাজুগুজু করতে আর ঠাকুমা কাঁসার বাসন নামাতে গিয়ে আবিষ্কার করল তোর পটে আঁকা লক্ষ্মী। দেখে ঠাকুমার এতো ভাল লাগল যে ঠিক হল এবার ওই পটের মা’লক্ষ্মীকেই পুজো করব আমরা।
“কিন্তু তাহলে বাড়ির ঐতিহ্যের কি হবে? কতকাল ধরে তো…”

ওকে থামিয়ে দিয়ে ঠাকুমা বলল, “সে তোকে ভাবতে হবে না। আমার লক্ষ্মীমন্ত নাতনির জন্য সেসব মঞ্জুর”।   

আনন্দে চোখে জল এল পদ্মপ্রিয়ার, ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরল ঠাকুমাকে। ঠাকুমা নাতনির মাথায় স্নেহচুম্বন এঁকে দিলেন, “তোর যে সত্যিই এতো গুণ আমি জানতুম না।”

দুষ্টুমির হাসি হেসে পদ্মপ্রিয়া মা আর কাকিমাকে বলল, “এবার তোমরা খড়িমাটির আল্পনা দেওয়া ছাড়ো। আমি ফুলের পাপড়ি আর গুঁড়ো রঙ দিয়ে রঙ্গোলি করে দিচ্ছি।”

তারপর পুজোটুজো মিটে গেল খুব ভালভাবে। পদ্মপ্রিয়া একফাঁকে গিয়ে সেই বাক্সের নাড়ু বিলিয়ে দিল বস্তির কুসমি, পল্টু, জিষ্ণু, হিয়াদের মধ্যে। ছোড়দা গেল ব্যানার্জীবাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আর সুরভীর সাথে দেখা করতে।            

ও ছাদে উঠে দেখল খুব বড় কোজাগরী চাঁদ উঠেছে, ঠিক ঝকঝকে রুপোর থালার মতো লাগছে চাঁদটাকে। হঠাৎ কোত্থেকে একটা সাদা লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে এসে ছাদে বসল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে উষ্ণীষের ফোন, “তোর জন্য একবাক্স  নারকেল নাড়ু আর নারকেল সন্দেশ রেখে দিয়েছি, কাল আসছিস তো?”

©জয়ী  

শুভ মহাষ্টমী

সর্বার্থসাধিকে,

জীবন যদি দুর্গোৎসব হয় তবে তুমি আমার অষ্টমী।
আমার প্রেম হোক অষ্টমীর অঞ্জলি,
আমার আকুলতা হোক পুষ্প,
আমার আবেগ হোক প্রসাদ,
মঙ্গলারতি আমার অনুরাগ,
একশ আট প্রদীপ হোক আমার আনন্দ,
আমার শৌর্য হোক পূজাউপাচার
আমার নৃত্যকলা হোক তোমার বিনোদন
আমার উচ্ছাস হোক তোমার ভোগ
আমার ত্রিশূল হোক তোমার ভরসা
আমার প্রগল্ভতা হোক তোমার পুষ্পমালা
আমার আনন্দ হোক তোমার আভরণ;
তুমি একবার তোমার দুর্গোৎসবে আমায় সামিল কর, বুঝিয়ে দের কতদূর সমর্পিত হতে পারি।
ইতি,
তোমার মহেশ্বর

©জয়ী

রসময়ীর ষষ্ঠী

ষষ্ঠীর সন্ধ্যে। আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে রসকদমে কামড় বসাল রসময়ী। ক্ষীরের খোলের ভিতর ছোট্ট গোলাপী রসোগোল্লা সত্যিই মন সব দঃখ-কষ্ট ভুলিয়ে দেয়….. সম্রাটকে না পাওয়ার দুঃখ, কোনো পরীক্ষায় হায়েস্ট না পাওয়ার দুঃখ, দুপুরের ঘুম ভেঙে যাওয়ার দুঃখ, ম্যাডক্স স্কোয়ারের আড্ডাবাজিতে পাত্তা না পাওয়ার দুঃখ, নতুন কাঞ্জীভরমে কফি পড়ে যাওয়ার দুঃখ, ফুচকার আলুমাখা পছন্দসই না হয়ার দুঃখ, প্রোমোশন আটকে যাওয়ার দুঃখ, সিকিম ট্যুর বাতিল হওয়ার দুঃখ, ষষ্ঠীর সকালে রাধাবল্লভী না খাওয়ার দুঃখ…রসময়ীর মনে হয় ইহলৌকিক জীবনে একসাথে খান দশেক রসকদম খাওয়ার সুখ পারলৌকিক সব সুখকে আতক্রম করতে পারে! হঠাৎ ওর মনে পড়ে থালার সব মিষ্টি ও একাই খেয়ে ফেলেছে!!
“সবাই এখন নিশ্চয়ই খুব মাঞ্জা দিয়ে সাজছে নয়ত ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে নয়ত আড্ডা দিচ্ছে। আর আমি কি সুন্দর একথালা সুস্বাদু রসকদম একা একা সাবাড় করছি…ঠিক দুর্গতিনাশিনীর পিছনদিকে বসে” হেসে ফেলে রসময়ী।

চিরন্তন নই

হে প্রিয়,

শুধু এটুকু মনে রেখো যে আমরা চিরন্তন নই,

চাঁদ-সূর্য চিরন্তন, ঝড়-বৃষ্টি চিরন্তন,

পর্বতের মাথায় লালরঙা সূর্যোদয়, নদীর বুকে পাথর, পাখির পরিত্যক্ত বাসা চিরন্তন,

চিরন্তন এমনকি আমাদের দুঃখের জীবনযাপনটুকুও,

তবু আমরা চিরন্তন নই, হব না কোনওদিন…

আমাদের গল্পটা রোজনামচা হওয়ার আগে, অভ্যাস হয়ে ওঠার আগে,
প্রাত্যহিক হয়ে ওঠার আগেই ভেঙে দেব সব,

ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব আমাদের যৌবনযাপন, প্রিয় আসবাব,

ফেলে দেব রঙিন পালক, পুঁতির হার, বইয়ের ভাঁজে শুকনো হয়ে যাওয়া গোলাপ,

কোনও খবর রাখব না তোমার প্রিয় বাঁশির, দেয়ালে ঝোলানো বাবুইয়ের বাসাটার,

যাওয়ার আগে ঝোলায় পুরে নেব আদরের “গীতবিতান”, মনভোলানো “সঞ্চয়িতা”

তোমার জন্য রেখে যাব “কালের মন্দিরা”, শঙ্খিনীর উপাখ্যান,

রেখে যাব গোধূলির শেষ আলোটুকু,

রেখে যাব মেঘলাদিনের শেষ বৃষ্টিটুকু!!

তাই তোমার আমার আর রূপকথা হওয়া হবে না,

আমি মুহূর্ততেই বেঁচে নেব সবটুকু বাঁচা,

মনে রাখব বসন্ত উৎসব, হলুদ-গোলাপি আবিরের লোকনৃত্য

মনে রাখব অষ্টমীর সকালের নরম রোদ, একসাথে অঞ্জলি,

মনে রাখব রবীন্দ্রজয়ন্তীতে করা প্রেম,

হিন্দোলযাত্রায় একসাথে চলা,   

মনখারাপি আষাঢ়ে বর্ষামঙ্গল শোনা…

তাই আমাদের গল্পটা ডাল-আলুপোস্ত হওয়ার আগে,

মাছবাজার হওয়ার আগে, সংসার হয়ে ওঠার আগে

ভুলে যাব এই প্রেমযাপন, এই বৃষ্টিভেজা, এই গঙ্গার হাওয়া!!

তোমায় মনে করব কালবৈশাখীতে

মনে করব শেষবিকেলের কমলা আলোয়, কোনএক নবমীর সকালে,    

মনে রাখব গ্রিক ট্র্যাজেডিতে,

মনে রাখব নর্ডিক রূপকথায়,

মনে রাখব গিটারের স্বরে,

তবু আমাদের গল্পটাকে কিছুতেই প্রাত্যহিক হতে দেব না!!

 

©জয়ী 

ট্রাফিক জ্যামের শহর

পূর্ব পরিচিত,

যদি ভীষণ কর্মব্যস্ত শহরের ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়ি,
তবে নিশ্চই তোমাকে মনে পড়বে।
যদি সামান্য মিছিল হলেই সার বেঁধে গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়,
যদি সকালে কার্ড পাঞ্চ করার তাড়ায় অস্থির হয়ে উঠি
আর ঠিক তখনই অবরোধ শুরু হয়
তবে তোমায় মনে পড়বে।
যদি সন্ধ্যেবেলায় ভীষণ ভিড়ে আটকে পড়ি,
কোনদিক দিয়েই পরিত্রাণের রাস্তা না থাকে,
যদি শুধু বাসে বসে গলদঘর্ম হই,
যদি ফোনটা হাতে নিয়ে হোয়াটস্যাপটুকুও দেখতে না ইচ্ছে করে
তবে নির্ঘাত তোমায় মনে পড়বে।
হয়তো বসে থাকব, সেই বিরক্তির স্রোতের মধ্যেও
আর দেখব, অন্যের ভিডিও কল, জোরে জোরে গান শোনা,
এতটুকু বিচলিত না হয়ে মুভি দেখা,
হয়তো তোমাকে ভুলতে উঁকি দেব তাদের মোবাইলে
তারা বিরক্ত হবে, বন্ধ করে দেবে ফোন, কিংবা সরিয়ে নেবে,
আমার নাগালের বাইরে,
আমি বাইরে তাকাব, রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির স্রোত,
ঘড়ির কাঁটায় আটটা দেখে হা হুতাশ করব,
গল্পে পড়া মরুভূমির উটের সারির কথা মনে পড়বে,
সাদা গাড়ির আধিক্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলব,
কালো গাড়ির কালোকাঁচ দেখে ঈর্ষা করব,
হলদে ট্যাক্সির জন্য মনকেমন করবে,
তোমার সাথে ট্রামভ্রমণের স্মৃতি উস্কে যাবে,
ওলা ক্যাব দেখে মুচকি হাসব,
আর এসবের মধ্যেই তোমাকে ভুলে যাওয়ার,
ভুলে থাকার ভীষণরকম চেষ্টা করব।
তবু ট্রাফিক জ্যাম রোজই হবে,
আর রোজ না চাইলেও তোমাকে মনে পড়বে !

আজ “ক” নিয়ে কাব্যি হোক

কুন্দনন্দিনী কাঞ্জীভরম আর কানবালায় সুসজ্জিত হয়ে চলল কাঞ্চিপুরমের কমলাক্ষ্মী মন্দিরে পুজো দিতে। কিঞ্জল কান্তিবিদ্যা চর্চা করছে সেই কান্তারমরুর দেশে। আর কল্কিনারায়ণের বাড়িতে তখন কলাবৌ স্নানের তোড়জোড়। কনিষ্ক বসে বসে কিষ্কিন্ধ্যাকান্ড পড়ছে। কৌশল্যা কোষাকুষি নিয়ে ব্যস্ত। কমল কলাপাতা কাটতে গেছে। কমলিনী আর কুন্দন কষ্টিপাথরের খোঁজ করছে। কোকিলকন্ঠী কৌশিকী কোকনদ ফোটানোয় ব্যস্ত। কাকাতুয়া ‘কোজাগরী’ ঘাড় বেঁকিয়ে সবকিছু পরখ করছে। কৈলাশেশ্বরীর পূজা চলছে কিন্তু কেউ এতটুকুও কুশল বিনিময় করছে না। সকলেই কালের কণাদে মনোনিবেশ করেছে।

অন্যদিকে কৌশানী কংসের কারাগার, কেদারনাথধাম, কনখল ঘুরে এখন কাশীতে এসেছে। কাশীশ্বরকে পুজো দিয়ে ও কচৌরি গলিতে ঢুকল কচুরি খেতে। কমলাভোগ ওর খুব প্রিয়। কেশরীজির কুঠী হল ওর কাশীর আস্তানা। কাশীতে ওর পরিচয় হয়েছে কিয়েভবাসী কেভিনের সঙ্গে; কেভিন কাঠিয়াবাবার শিষ্য।

কৃষ্ণরাজ এখন কলকাতা ছেড়ে অনেকদূরে, সুদূর কাবুলে। কষা মাংস আর কবিরাজী খায়নি অনেকদিন হল। কিয়ারার সান্নিধ্যেও কঙ্কাবতীকে এতটুকু ভোলেনি ও। কঙ্কাবতী এদিকে কার্ডিফে বসে কাস্টার্ড খাচ্ছে। কৃশান্যা, কৌমুদী, কর্ণিকরা কস্মিনকালেও কল্কিবাড়িতে পুজো দেখতে আসেনি; কেশব কাজিরাঙা বেড়াতে গেছে; কানাইলাল কাজু, কিসমিস, কেসর সহযোগে কাশ্মীরী পোলাও রাঁধতে ব্যস্ত । এরা সকলেই কল্কিবাড়ির সদস্য ! সৌভাগ্য/দুর্ভাগ্যবশত একমাত্র সেটিই এখন যোগাযোগের সুতো।